পবিত্র কুরআন শরীফ এর প্রথম বাংলা অনুবাদ


http://www.rongmohol.com/extensions/pic_man/img/upload/4724Girish_chandra_sen.JPG
গিরিশচন্দ্র সেন (১৮৩৪ বাংলা ১২৪১ - ১৯১০)। ভাই গিরিশচন্দ্র সেন নামে তিনি অধিক পরিচিত। তাঁর প্রধান পরিচয় ইসলাম ধর্মের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআন- এর প্রথম বাংলা অনুবাদক হিসেবে। তখন প্রায় ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে সাধারণ মানুষের ধারণা ছিল যে, মূলভাষা থেকে অনূদিত হলে গ্রন্থটির পবিত্রতা ক্ষুণ্ন হবে। পবিত্র কুরআন সম্পর্কেও এমন ধারণা ছিল। এ কারণে অনেক মুসলিম মনীষী এর বঙ্গানুবাদ করতে সাহস পাননি। গিরিশচন্দ্র সেনই অন্য ধর্মালম্বী হয়েও এই ভয়কে প্রথম জয় করেন। শুধু কুরআন শরীফের অনুবাদ নয় তিনি ইসলাম ধর্ম বিষয়ক অনেক গ্রন্থ অনুবাদ করেন। তিনি ইসলাম ধর্ম নিয়ে অনেক গবেষণাও করেন।
জন্ম ও বংশপরিচয়
ভাই গিরিশচন্দ্র সেন বর্তমান নরসিংদী জেলার পাঁচদোনা গ্রামে এক বিখ্যাত দেওয়ান বৈদ্যবংশে জন্মগ্রহণ করেন।[১] গিরিশচন্দ্রের পিতা ছিলেন মাধবরাম সেন এবং পিতামহ ছিলেন রামমোহন সেন। গিরিশচন্দ্ররা ছিলেন তিন ভাই। ঈশ্বরচন্দ্র সেন, হরচন্দ্র সেন এবং সর্বকনিষ্ঠ গিরিশচন্দ্র সেন। ভাই গিরিশচন্দ্র সেনের পরিবার ছিল অত্যন্ত গোঁড়াপন্থি। পরিবারে সনাতন ধর্মের আচরণ প্রয়োজনের তুলনায় একটু বাড়াবাড়ি রকমভাবেই মেনে চলা হতো। এমন একটি কুসংস্কারাচ্ছন্ন পরিবারে জন্ম নিয়েও গিরিশচন্দ্র সেন একজন সম্পূর্ণ সংস্কার মুক্ত মানুষ হয়েছিলেন। অন্য ধর্মের উপর গবেষণা করে খ্যাতি অর্জন করেছিলেন।
বাল্যকাল ও আরবি শিক্ষা
প্রাথমিক পড়া শেষ করে গিরিশচন্দ্র ঢাকার পোগোজ বিদ্যালয়ে ভর্তি হন। কিন্তু তিনি বেশিদিন বিদ্যালয়ে তাঁর পড়াশোনা হয়নি। তাঁর বিদ্যালয় ছাড়ার কারণ নিয়ে একটি ঘটনা প্রচলিত রয়েছে। একদিন তিনি শ্রেণীকক্ষে দেখলেন শিক্ষক তাঁর এক সহপাঠীকে পড়া না পারার জন্য খুব মারছেন। এই দেখে তাঁর মনেও ভয় ধরে গেল, শিক্ষক যদি তাঁকেও মারেন। এই ভয়ে তিনি বিদ্যালয় থেকে পালিয়ে বাসায় চলে এলেন। তাঁর বিদ্যালয়ে লেখাপড়ার এখানেই সমাপ্তি। এরপর তিনি পাঁচদোনায় নিজের বাড়িতে ফিরে আসেন। তার পাশের গ্রাম শানখোলায় কৃষ্ণ চন্দ্র রায় নামে একজন খুব ভালো ফারসি জানা লোকের কাছে গিরিশচন্দ্র ফারসি ভাষা শিখতে শুরু করেন।[১] বছর দুয়েকের মধ্যে ফারসি ভাষা তিনি বেশ ভালো ভাবেই আয়ত্ব করে ফেলেন। গিরিশচন্দ্র ময়মসিংহের ডেপুটি ম্যাজিষ্ট্রেট ও কাজী মৌলবী আব্দুল করিম সাহেবের কাছে রোক্কাতে আল্লামী অধ্যয়ন করেন।
১৮৭৬ সালের আরবি শিক্ষার জন্য গিরিশ চন্দ্র লক্ষ্মৌ যান। লক্ষ্মৌ ব্রাহ্ম সমাজের আনুকূল্যে এবং সহযোগিতায় জ্ঞানবৃদ্ধ মৌলবী এহসান আলী সাহেবের কাছে আরবি ব্যাকরণ ও দিওয়ান-ই-হাফিজের পাঠ গ্রহণ করেন। লক্ষ্মৌ থেকে কলকাতায় ফিরে একজন মৌলবীর কাছে এ বিষয়ে আরও কিছু শিক্ষা গ্রহণ করেন। এরপর ঢাকায় নলগোলায় মৌলবী আলিমউদ্দিন সাহেবের কাছে আরবি ইতিহাস ও সাহিত্যের পাঠ গ্রহণ করেন।[১]
কর্মজীবনে প্রবেশ
বেশ কিছুদিন বেকার বসে থাকার পর তিনি তাঁর মেজভাইয়ের সাথে চাকরির খোঁজে ময়মনসিংহ গমন করেন। সেখানে তিনি ময়মনসিংহ জেলাস্কুলে সহকারী শিক্ষকের (দ্বিতীয় পন্ডিত) পদে যোগদান করেন। কিন্তু গিরিশচন্দ্র সামান্য এক চাকরির মাঝে নিজেকে আবদ্ধ করে রাখতে পারলেন না। তাঁর ছিল জ্ঞানের পিপাসা। তিনি নিজে নিজেই পড়াশোনা শুরু করলেন। সাংবাদিকতা ও সাহিত্যচর্চাও শুরু করলেন গিরিশচন্দ্র। তৎকালীন ঢাকা থেকে প্রকাশিত 'ঢাকা প্রকাশ' পত্রিকায় তিনি ময়মনসিংহের সংবাদদাতা ছিলেন। তাছাড়া এই পত্রিকায় তাঁর অনেকগুলো লেখাও প্রকাশিত হয়েছিল।
ব্রাহ্ম ধর্মের দীক্ষালাভ
চাকরি ছেড়ে দিয়ে গিরিশচন্দ্র কলকাতায় গমন করেন। কলকাতায় যাওয়ার পর তাঁর সাথে দেখা হয় রাজা রামমোহন রায় প্রবর্তিত ব্রাহ্মধর্মের তৎকালীন প্রচারক কেশবচন্দ্র সেনের। সে সময় কেশবচন্দ্র ছিলেন ব্রাহ্মধর্মের নববিধান শাখার প্রধান। তাঁরই প্রভাবে গিরিশচন্দ্র সেন ব্রাহ্ম মতবাদে দীক্ষা গ্রহণ করেন। ব্রাহ্মসমাজ তাঁর কর্তব্যনিষ্ঠায় মুগ্ধ হয়ে তাঁকে ভাই উপাধিতে ভূষিত করে।
কুরআনের প্রথম বাংলা অনুবাদক
কেশবচন্দ্রের অনুরোধ ও ব্যবস্থাপনাতে তিনি ফারসি ভাষায় আরো গভীর জ্ঞান লাভ এবং আরবি-ফারসি সাহিত্যের ওপর পড়াশোনা করার জন্য কানপুর ও লখনউ গমন করেন। ফিরে আসার পর কেশবচন্দ্রের উৎসাহেই তিনি ইসলামি দর্শনের উপর গবেষণা শুরু করেন। কিন্তু ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে পড়াশোনা ও গবেষণা করার জন্য প্রধান বাঁধাই ছিল ভাষা। হিন্দু ও খ্রিস্ট ধর্মের ধর্মগ্রন্থসমূহ অনেক আগেই বাংলায় অনূদিত হয়েছিল, কিন্তু ইসলাম ধর্মের কোন ধর্মশাস্ত্রই বাংলাভাষায় ছিলনা। বিশেষ করে পবিত্র কুরআন ও হাদিস তখনো বাংলায় প্রকাশিত হয়নি। যার ফলে কুরআনের মর্মার্থ অনুবাধন করা থেকে বৃহত্তর মুসলিম গোষ্ঠী পুরোপুরিই বঞ্চিত ছিল। তাই ব্রাহ্মসমাজের কেশবচন্দ্র সেন পরিচালিত নববিধান সভা ইসলাম ধর্মগ্রন্থসমূহ বাংলায় অনুবাদ করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। স্বাভাবিকভাবেই, আরবি-ফারসি ভাষার সুপন্ডিত ভাই গিরিশচন্দ্র সেন অত্যন্ত দক্ষতার সাথে এ দায়িত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন করেন।
লেখক গিরিশচন্দ্র সেন
তিনি কুরআন শরীফের সম্পূর্ণ অংশ, মিশকাত শরীফের প্রায় অধিকাংশ, হাদিস, তাজকিরাতুল আউলিয়া, দিওয়ান-ই-হাফিজ, গুলিস্তাঁ, বুঁস্তা, মকতুব্বত-ই-মাকদুস, শারফ উদ্দিন মুনিবী, মসনভী-ই-রুমী, কিমিয়া-ই-সাদত, গুলশান-ই-আসরার ইত্যাদিসহ বহু ইসলামি গ্রন্থ বাংলায় অনুবাদ করেন।
কুরআনের অনুবাদ প্রকাশ
[justify]অনুবাদক হিসেবে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তিনি কুরআনের অনুবাদের কাজ শুরু করেন। তিনি পর্যায়ক্রমে মোট ১২ টি খন্ডে এই অনুবাদক্ররম সমাপ্ত করেন। 'তাপসমালা'র দুটো খন্ড বের হওয়ার পর ১৮৮১ সালের ১২ ডিসেম্বর কুরআনের প্রথম খন্ড প্রকাশিত হয়। প্রথম খন্ড প্রকাশের সময় গিরিশচন্দ্র অনুবাদকের নাম গোপন রাখেন। কারণ তৎকালীন সময়ে কাজটি যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। মুসলিম সমাজে এর প্রতিক্রিয়া কি হতে পারে সে সম্পর্কে তাঁর কোন ধারণাই ছিলনা। গ্রন্থটিতে শুধুমাত্র প্রকাশক গিরিশচন্দ্র সেন এবং মুদ্রক তারিণীচরণ বিশ্বাসের নাম ছিল। ৩২ পৃষ্ঠার এই খন্ডের মূল্য ছিল মাত্র চারআনা। কিন্তু গিরিশচন্দ্রের আশংকা সম্পূর্ণ ভুল প্রমাণিত হলো। মুসলমান আলেমসমাজ এই মহৎকর্ম সম্পাদন করার জন্য এই অজ্ঞাতনামা অনুবাদকের প্রশংসা করে ব্রাহ্মসমাজের নিকট পত্র প্রেরণ করেন। তাঁদের প্রশংসাপূর্ণ পত্রের অংশবিশেষ নিন্মে তুলে ধরা হলোঃ
“    
আমরা বিশ্বাস ও জাতিতে মুসলমান। আপনি নিঃস্বার্থভাবে জনহিত সাধনের জন্য যে এতোদৃশ চেষ্টা ও কষ্ট সহকারে আমাদিগের পবিত্র ধর্মগ্রন্থ কুরআনের গভীর অর্থ প্রচারে সাধারণের উপকার সাধনে নিযুক্ত হইয়াছেন, এজন্য আমাদের আত্যুত্তম ও আন্তরিক বহু কৃতজ্ঞতা আপনার প্রতি দেয়। 

“    
কুরআনের উপরিউক্ত অংশের অনুবাদ এতদূর উৎকৃষ্ট ও বিস্ময়কর হইয়াছে যে, আমাদিগের ইচ্ছা, অনুবাদক সাধারণ সমীপে স্বীয় নাম প্রকাশ করেন। যখন তিনি লোকমন্ডলীয় এতোদৃশ্য উৎকৃষ্ট সেবা করিতে সক্ষম হইবেন, তখন সেই সকল লোকের নিকট আত্ন-পরিচয় দিয়া তাঁহার উপযুক্ত সম্ভ্রম করা উচিত।

কুরআন অনুবাদ শেষ করে ভাই গিরিশচন্দ্র্র সেন বলেছিলেনঃ
“    
আজ কুরআনের সমাপ্ত দেখিয়া আমার মনে যুগপৎ হর্ষ-বিষাদ উপস্থিত। হর্ষ এই যে, এত কালের পরিশ্রম সার্থক হইল। বিষাদ এই যে, ইহার প্রথমাংশ শ্রী মদাচার্য্য কেশবচন্দ্রের করকমলে অর্পণ করিয়াছিলাম। তিনি তাহাতে পরমাহ্লাদিত হইয়াছিলেন এবং তাহার সমাপ্তি প্রতীক্ষা করিতেছিলেন। শেষাংশ আর তাঁহার চক্ষুর গোচর করিতে পারিলাম না। ঈশ্বর তাঁহাকে আমাদের চক্ষুর অগোচর করিলেন। তিনি অনুবাদের এরূপ পক্ষপাতী ছিলেন যে, তাহার নিন্দা কেহ করিলে সহ্য করিতে পারিতেন না। আজ অনুবাদ সমাপ্ত দেখিয়া তাঁহার কত না আহ্লাদ হইত, এছাড়াও তাঁহার কত আশীর্ব্বাদ লাভ করিত।

কুরআনের সম্পূর্ণ খন্ড একত্রে প্রকাশিত হয় ১৮৮৬ সালে। সম্পূর্ণ খন্ডেই প্রথম তিনি স্বনামে আত্নপ্রকাশ করেন। ভাই গিরিশ্চন্দ্র সেন অনূদিত কুরআনের চতুর্থ সংস্করণে মৌলানা আকরাম খাঁ একটি প্রশংসাসূচক ভূমিকা লিখেছিলেন। 
হাদিসের অনুবাদ
কুরআনের পর তাঁর আর একটি বড় কাজ হাদিসের অনুবাদ। হাদিসও কয়েকখন্ড পর্যায়ক্রমে প্রকাশিত হয়। এর প্রথম খন্ড হাদিস-পূর্ব-বিভাগ (১ম খন্ড) প্রকাশিত হয় ১৮৯২ সালের ২৪ জানুয়ারি। শেষ খন্ড হাদিস-উত্তর-বিভাগ (৪র্থ খন্ড) প্রকাশিত হয় ১৯০৮ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর।
মৃত্যু
মুক্তমনা ও অসাধারণ মানুষ ভাই গিরিশচন্দ্র সেন ১৯১০ সালের ১৫ আগস্ট মৃত্যুবরণ করেন।


তথ্যসুত্র : বাংলা উইকি
সবটুকু একত্রে পড়ুন "পবিত্র কুরআন শরীফ এর প্রথম বাংলা অনুবাদ"
Posted in by Akashnill. No Comments

সুখী জীবনের জন্য- অটোসাজেশন


বারবার উচ্চারিত ইতিবাচক শব্দের প্রভাব সম্পর্কে সাধকেরা সচেতন ছিলেন আদিকাল থেকেই। নবীজী (স.) বলেছেন কারো সাথে দেখা হলে সালাম বিনিময়ের পর কুশল জিজ্ঞেস করলে বলবে, “শোকর আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালো আছি”। তিনি এটা কেন বলেছিলেন, বললে কী লাভ হবে, কেন বলবো তা আমরা হাজার বছর ধরেও বুঝি নি। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের প্রথম সারির বেশ কয়েকজন চিকিৎসকের এ বিষয়ের গবেষণা ও প্রয়োগ প্রক্রিয়া তাক লাগিয়ে দেয় পুরো বিশ্বকে। এমনই একজন ফরাসী মনোবিজ্ঞানী ডা. এমিল কোয়ে। ১৯১০ সাল থেকে তিনি শুরু করলেন নিরাময়ের ক্ষেত্রে অটোসাজেশন চর্চার গুরুত্ব নিয়ে গবেষণা। কোনো প্রকার ওষুধ ছাড়াই শুরু করেন বিভিন্ন ধরনের মনোদৈহিক রোগের চিকিৎসা। তার ক্লিনিকে আসা রোগীদেরকে সকাল-বিকাল একাগ্র মনোযোগ দিয়ে একটি অটোসাজেশন বলতে হতো, ‘ডে বাই ডে ইন এভরি ওয়ে আই এম গেটিং বেটার এন্ড বেটার’। এভাবেই সকাল-বিকাল বিশ বার চর্চা করে হাজার হাজার রোগী মাইগ্রেন, মাথাব্যাথা, বাতব্যাথা, প্যারালাইসিস, তোতলামি, গ্যাস্ট্রিক, আলসার, অনিদ্রা এমনকি টিউমার পর্যন্ত ভালো হয়ে গেল। বাংলাদেশেও প্রফেসর এম ইউ আহমেদ প্রবর্তিত মেডিস্টিক সাইকো থেরাপি প্রক্রিয়ায় একইভাবে হাজার হাজার রোগী বিভিন্ন ধরনের জটিল ব্যাধি থেকে মুক্ত হয়েছেন।
ইতিবাচক এ অটোসাজেশনের শক্তির মূল রহস্য কোথায় ?
মনোবিজ্ঞানীরা গবেষণা করে দেখেছেন যে আমাদের মন বা নার্ভাস সিস্টেম বাস্তবতা ও কল্পনার মধ্যে পার্থক্য করতে পারে না। তাই নাটক বা সিনেমায় কোনো হাসির জিনিস দেখলে যেমন চোখে মুখে হাসির রেশ ফুটে ওঠে, তেমনি কোনো বিরহ বা বিচ্ছেদের ঘটনা দেখলে মন খারাপ হয়ে যায়। অথচ আমরা জানি এর পুরোটাই অভিনয়। তার পরেও উত্তেজনা ও বিষাদের রেশ আমাদের মনের ভেতর অনেকক্ষণ থাকে। বাস্তবেও যখন আমরা কখনো এরকম কোনো ইতিবাচক বা নেতিবাচক শব্দ উচ্চারণ করি তার প্রভাব আমাদের দেহে মনে অনুভব করি। কারণ বারবার ভালো থাকার একই বাণী উচ্চারণ করার ফলে মস্তিষ্কে ভালো থাকার তরঙ্গ তৈরি হয়। ভালো থাকার বিশ্বাস মনে ভালো থাকার আকুতি সৃষ্টি করে। নিউরো সাইন্টিস্টরা দীর্ঘ গবেষণা করে দেখেছেন, মস্তিষ্কে যখন কোনো নতুন তথ্য যায়, তখন একটি নিউরোন থেকে আরেকটি নিউরোনে নতুন সংযোগ পথ তৈরি হয় এবং মস্তিষ্কের কর্ম কাঠামো বদলে যায়। তখন নতুন বাস্তবতা সৃষ্টিতে মস্তিষ্ক কাজে লেগে যায়। সচেতন মনে বা অবচেতন মনে আমরা যা চিন্তা করি বা মস্তিষ্কে কমান্ড করি তারই বাস্তবতা আমাদের চারপাশে সৃষ্টি হয়। যে কারণে পারিপার্শ্বিক পরিবেশে নিজেরাই নিজেকে অযোগ্য করে তুলি। সারাদিন পোড়া কপাল ভাবলে বা নিজেকে অবহেলিত ও অযোগ্য ভাবলে যার কাছে গেলে অবহেলিত হবেন মূল্যায়িত হবেন না ,অযোগ্য বলে বিবেচিত হবেন তার কাছেই পৌঁছাতে মস্তিষ্ক কাজ শুরু করে দেবে। নিজেকে সফল সুস্থ ও প্রশান্ত রাখার জন্য তাই অটোসাজেন হচ্ছে এক অব্যর্থ প্রক্রিয়া। যখন আপনি মস্তিষ্কে ভালো থাকার প্রোগ্রাম দিবেন, মস্তিষ্কই তখন আপনাকে আইডিয়া দেবে কিভাবে কাজ করলে আপনি সফল হবেন, প্রশান্ত থাকতে পারবেন সুখী হবেন। মনোবিজ্ঞানীরা এ সূত্রটিকেই ব্যবহার করেছেন কখনো অটোসাজেশনে আবার কখনো মনছবিতে। শুধু রোগ-ব্যাধি নয়, জীবনের এমন কোনো দিক নেই যেখানে অটোসাজেশন চর্চায় বদলের হাওয়া লাগে নি।


১. ঘুম ভাঙতেই বলবো,  শোকর আলহামদুলিল্লাহ/ থ্যাঙ্কস গড/ প্রভু ধন্যবাদ! একটি নতুন দিনের জন্যে।
২. আমি জানি, "রেগে গেলেন তো হেরে গেলেন"। রাগ নিয়ন্ত্রণে রেখে আমি সবসময় জয়ী হবো।
৩. বিশ্বাস শক্তির আকর। আমি বিশ্বাসী। বিশ্বাসের শক্তি আমার সাফল্যকে নিশ্চিত করবে।
৪. অন্যের দোষ সহজেই খুজেঁ পাওয়া যায়, নিজের দোষ খুজেঁ পাওয়াটা খুব কষ্টকর। আমি এই কষ্টকর কাজটিই আজ করবো।
৫. আমি সবসময় হাসিমুখে কথা বলবো। যে যা-ই বলুক- সবসময় প্রো-অ্যাকটিভ থাকবো।
৬. কর্ম ছাড়া প্রার্থনা কবুল হয় না। তাই প্রার্থনার পাশাপাশি আমি কাজের প্রতিও গুরুত্ব দেবো।
৭. জন্ম বা বংশ নয়, কর্মই মানুষকে মহান করে। সৎকর্মে নিবেদিত হয়ে আমিও মহান হবো।
৮. সভ্যতার সবকিছু মানুষের সৃষ্টি। আমিও মানুষ। আমারও রয়েছে বিশাল সম্ভাবনা। আমি সম্ভাবনাকে কাজে লাগাবো।
৯. নরকে যাওয়ার প্রধান রাজপথ আলস্য। তাই আমি পরিকল্পিত কর্মব্যস্ত জীবনযাপন করবো।
১০. সুস্থ দেহ, প্রশান্ত মন, কর্মব্যস্ত, সুখী-জীবন।
সবটুকু একত্রে পড়ুন "সুখী জীবনের জন্য- অটোসাজেশন"
Posted in by Akashnill. No Comments

"সকল ধর্মের মূল উৎস এক; পৃথিবীর মানুষ এক পরিবার"

আল্লামা ড. এম শমশের আলী
"সকল ধর্মের মূল উৎস এক; পৃথিবীর মানুষ এক পরিবার"  দেশ বরেণ্য বিজ্ঞানী ও ইসলামী চিন্তাবিদ আল্লামা ড. এম শমশের আলীর এই আলোচনা আশা করি আপনাদের ভাল লাগবে। 
http://www.rongmohol.com/extensions/pic_man/img/upload/47081.1.bmp
http://www.rongmohol.com/extensions/pic_man/img/upload/47092.2.bmp
http://www.rongmohol.com/extensions/pic_man/img/upload/47103.3.bmp
http://www.rongmohol.com/extensions/pic_man/img/upload/47114.4.bmp
"হে মানুষ শোনো!" সিডির অডিও গুলো ডাউনলোড করতে এখানে ক্লিক করুন অথবা এখানে ক্লিক করুন।
আলোচনার অংশ-বিশেষ ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন।
সূত্র: কোয়ান্টাম বুলেটিন (আগষ্ট ২০১১)
সবটুকু একত্রে পড়ুন ""সকল ধর্মের মূল উৎস এক; পৃথিবীর মানুষ এক পরিবার""

মহানবী (সা) এর চল্লিশ হাদীস।পর্ব-১

মহানবী (সা.) বলেছেন “যে ব্যক্তি আমার উম্মতের উপকারার্থে ৪০টি হাদীস শুনাবে এবং হেফ্য করবে, আল্লাহ তায়ালা তাকে কেয়ামতের দিন আলেম ও শহীদগণের সহিত উঠাবেন এবং বলবেন, যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা বেহেশতে প্রবেশ কর।”



১. “তোমাদের মধ্যে আমার নিকট সেই ব্যক্তি বেশী প্রিয় যে বেশী চরিত্রবান।” ( বোখারী)

২. “কোন মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এটাই যথেষ্ট যে, সে যাই শোনে তাই যাচাই না করেই অন্যের কাছে বর্ণনা করে দেয়।” (মুসলিম)

৩. “হৃদয়রে প্রাচুর্যই প্রকৃত প্রাচুর্য।” (বোাখারী)

৪. “আল্লাহ তায়ালার নিকট সেই আমলই সব চাইতে প্রিয় যা নিয়মিত করা হয়, যদিও তা পরিমাণে অল্প হয়।” (বোখারী)

৫. “যখন তুমি লজ্জা করবে না, তখন যা ইচ্ছা তাই কর।” (অর্থাৎ যখন লজ্জা নাই, তখন সকল প্রকার মন্দই সমান) (বোখারী)

৬. “ঐ ব্যক্তি বীর নয় যে কুস্তিতে লোকজনকে পরাভূত করে বরং বীর ঐ ব্যক্তি যে ক্রোধের সময় নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখে।” (বোখারী)

৭. “যে ব্যক্তি নম্র আচরণ হতে বন্ঞিত সে সকল প্রকার কল্যাণ হতে বন্ঞিত।” (মুসলিম)

৮. “ঐ ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ মুসলমান যার মুখ ও হাতের অনিষ্ট হতে মুসলমানগন নিরাপদ থাকে।” (মুসলিম)

৯. “আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী বেহেশতে প্রবেশ করবে না।” (বোখারী)

১০. “যার অনিষ্ট হতে তার প্রতিবেশীগণ নিরাপদ নয়, সে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।” (বোখারী)

১১. ~যার অনিষ্ট হতে তার প্রতিবেশীগণ নিরাপদ নয়, সে বেহেশতে প্রবেশ করতে পারবে না।"
(বোখারী)
১২. ~পারস্পরিক সম্পর্ক ছিন্ন করিও না, একে অন্যের ছিদ্রান্বেষণ করিও না, পরস্পরে ঈর্ষা পোষণ করিও না, একে অন্যকে হিংসা করিও না এবং হে আল্রাহর বান্দাগণ তোমরা সকলে ভাই ভাই হইয়া বাস কর।" (বোখারী)

১৩. ~কবরসমূহকে সিজদার জায়গা বানাইও না।" (মুসলিম)

১৪. ~ তোমরা শাসনকর্তার আদেশ-নিষেধ মেনে চলবে এবং তাঁর অনুগত থাকবে_- অত্যন্ত ছোট মাথাবিশিষ্ট কৃষ্ঞবর্ণ হাবশী লোককেও যদি তোমাদের উপর শাসনকর্তা নিযুক্ত করা হয়।" (বোখারী)

১৫. খানসা বিনতে খেযাম (রা.) মদীনাবাসিনী নারী সাহাবী হতে বর্ণিত আছে, তিনি বিবাহিতা ছিলেন, পরবর্তী বিবাহকালে তাঁর পিতা তাঁকে বিবাহ দিয়া দেন, অথচ তিনি সেই বিবাহে মোটেই সম্মত ছিলেন না। তিনি হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) নিকট উপস্থিত হয়ে ঘটনা জ্ঞাত করিলেন। হযরত (সা.) সেই বিবাহ বাতিল করে দিলেন।
(বোখারী)

১৬. একবার বিবাহ হয়েছে এরুপ নারীকে (দ্বিতীয় বার) বিবাহ দানে তাহার স্পষ্ট অনুমতি গ্রহণ করতে হবে এবং কুমারীকে বিবাহ দানেও তাহার সম্মতি নিতে হবে।
(বোখারী)

১৭. ক্ষুধার্তকে খাদ্য দাও, রোগীকে দেখতে যাও এবং ক্রীতদাসকে মুক্ত কর।
(বোখারী)

১৮. ব্যাঙের ছাতা (মাশরুম) ‘মন্ন’ তুল্য; তার রস চোখের জন্য ভাল ঔষধ।
(বোখারী)

১৯. কোন কিছুকে অশুভ অমঙ্গল বা কুলক্ষণ গণ্য করিও না-ঐরুপ ধারণা অলীক ভিত্তিহীন।
(বোখারী)

২০. যে কোন মুসলমান কোন বৃক্ষ রোপণ করল, অত:পর উহা হতে কোন পশু বা মানুষ কিছু অংশ খেল, তাতে ঐ ব্যক্তি দান-খয়রাত করার সওয়াব লাভ করবে।
(বোখারী)

২১. যে ব্যক্তি অত্যাচার করে অর্ধহাত যমীন দখল করতে, নিশ্চয়ই ক্বিয়ামতের দিন অনুরুপ সাতটি যমীন তার কাঁধে ঝুলিয়ে দেয়া হবে।
(বোখারী)

২২. বিচারক তিন প্রকার। এক শ্রেণীর বিচারক জান্নাতী, আর দুই শ্রেণীর বিচারক জাহন্নামী। (১) যে বিচারক সত্য উপলব্ধি করে এবং তদনুযায়ী বিচার করে সে জান্নাতী। (২) যে বিচারক সত্য উপলব্ধি করতে পারে কিন্তু তদনুযায়ী বিচার করে না, সে জাহান্নামী। (৩) আর এক শ্রেণীর বিচারক সত্য উপলব্ধি করতে পারে না। অজ্ঞতার ভিত্তিতে বিচার করে সেও জাহান্নামী। 
(আবু দাউদ)

২৩. নিশ্চয়ই সূদ এমন বস্তু যার পরিণাম হচ্ছে সংকুচিত হওয়া যদিও তা বৃদ্ধি মনে হয়।
(ইবনে মাজাহ)

২৪. আল্লাহ তায়ালা তিন শ্রেণীর লোকের সাথে ক্বিয়ামতের দিন কথা বলবেন না। (১) বয়সপ্রাপ্ত যেনাকার (২) মিথ্যুক শাসক (৩) অহংকারী দরিদ্র।
(মুসলিম)

সবটুকু একত্রে পড়ুন "মহানবী (সা) এর চল্লিশ হাদীস।পর্ব-১"

জীবে দয়া

সাগরে ফেলা হচ্ছে লবস্টার

সাগরে ফেলা হচ্ছে লবস্টার

ফুটন্ত পানিতে ভরা হাঁড়ির বদলে লবস্টারগুলোর ঠাঁই হলো আটলান্টিক মহাসাগরের গভীর জলে। গলদা চিংড়িজাতীয় সুস্বাদু খাবারের উপকরণ প্রাণীগুলোর ভাগ্য খুবই ভালো বলতে হয়। ওরা পড়েছিল একদল নিরামিষভোজী তিব্বতি বৌদ্ধের হাতে।
আর্থিক অবস্থা আহামরি না হলেও শুধু মায়া থেকে যুক্তরাষ্ট্রের ম্যাসাচুসেটসের এক মাছবাজার থেকে ৬০০ পাউন্ড লবস্টার কেনে ৩০ বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীর একটি দল। প্রতি পাউন্ড ১১ ডলার করে দাম পড়ে পাক্কা ছয় হাজার ৬০০ ডলার। কিন্তু সুস্বাদু এই প্রাণীগুলোকে খাবারের টেবিলে না নিয়ে নৌকা ভাড়া করে গিয়ে ছেড়ে দেন আটলান্টিকে। ধারালো নখযুক্ত পায়ে বাঁধা ব্যান্ড খুলে একে একে ৫৩৪টি লবস্টারকে তুলে সমুদ্রে ছাড়েন বৌদ্ধ ভিক্ষু জেশি তেনলে। ছাড়ার আগে তাদের ওপর পবিত্র জলও ছিটানো হয়।
৩ আগস্ট বৌদ্ধ ধর্মের অন্যতম প্রধান উৎসব ‘ধর্মচক্র প্রবর্তন দিবস’ উপলক্ষে এই উদ্যোগ নেন ওই বৌদ্ধরা। বৌদ্ধ ধর্মের বিশ্বাস অনুযায়ী এ দিনে কোনো ভালো কাজ করলে বহুগুণ পুণ্য হয়। লবস্টারগুলোকে সমুদ্রে ছেড়ে নতুন জীবন দান করে প্রথম আলো
সবটুকু একত্রে পড়ুন "জীবে দয়া"

মাহে রামাযান সম্পর্কে কিছু কথা

রামাযান মানে কি?‎

রমাযান আরবী শব্দ। আরবী মাস সমূহের মাঝে একটি মাসের নাম। যার আভিধানিক অর্থ ঝলসিয়ে দেয়া, ‎জ্বালিয়ে দেয়া। রামাযানকে রামাযান এজন্য বলা হয়-(ক) সর্ব প্রথম যখন রামাযানে রোযা ফরয হয় তখন ‎প্রচন্ড গরম ছিল তাই এ মাসকে রামাযান বলা হয়। (খ) রামাযান মাসে আল্লাহ তায়ালা তার অবারিত ‎রহমত ও বরকত দিয়ে বান্দার পূর্ব মাসের গোনাহকে পুড়িয়ে ছাই করে দেন, এ হিসেবেও একে রামাযান ‎বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রোযা কাকে বলে?‎

আরবীতে যে শব্দকে সিয়াম বলে বলে তাকেই আমরা বাংলা উর্দু ও ফারসীতে রোযা বলে থাকি। রোযা ‎মৌলিকভাবে তিন যিনিস থেকে নিয়তের সাথে বিরত থাকার নাম। যথা-(ক) সহবাস (খ) খাবার গ্রহণ (ঘ) ‎পানীয় গ্রহণ।

রোযার ইতিহাস

দ্বিতীয় হিজরীতে মদীনায় থাকা অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করার মাধ্যমে রোযাকে ফরয ‎করেন মুসলমানদের উপর। মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে সূরায়ে বাক্বারার ১৮৩ নং আয়াতে ‎ইরশাদ করেন-‎‏ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ‎ অর্থাৎ হে ‎মুমিনরা! আমি তোমাদের উপর রোযাকে ফরয করেছি যেমন ফরয করা হয়েছিল পূর্ববর্তীদের উপর যেন ‎তোমরা পরহেযগার হতে পার।(সূরা বাক্বারা-১৮৩) এই আয়াতের মাধ্যমে একথা স্পষ্ট বুঝা যায়, ‎উম্মাতে মুহাম্মদীর পূর্বে অন্য নবীর উম্মাতের উপরও রোযা ফরয ছিল। যেমন বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে যে ‎বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে তার সারাংশ হচ্ছে-কারো কারো মতে পূর্বের সকল উম্মতের উপরই তা ‎ফরয ছিল কারো কারো মতে কিছু কিছু উম্মতের উপর। তবে এ ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত যে, ‎খৃষ্টানদের উপর রামাযানের রোযা ফরয ছিল উম্মাতে মুহাম্মদীর মত। খৃষ্টানদের ক্ষেত্রে বিধান ছিল ‎রামাযানের রাতে ঘুমানোর পর থেকে পরদিনের সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করতে ‎পারবেনা। এ বিষয়টি তাদের কাছে কঠিন মনে হলে শীত ও গ্রীষ্মকালে তারা মনমত রোযার সংখ্যা পাল্টে ‎নিত। অর্থাৎ যে সময়ের রমাযান মাস কষ্টদায়ক হত সে সময় তারা রোযা ১০ টা রাখতো পরের বছর ২০ ‎টি অতিরিক্ত রেখে রোযা ৫০টি রাখত। রোযার ফরয হবার পরও খৃষ্টানদের উপর আপতিত বিধান অনুযায়ী ‎মুসলমানরা রোযা রাখতে শুরু করেন। অর্থাৎ রামাযানের রাতে ঘুমানোর পর থেকেই রোযা শুরু হয়ে ‎যায়। ঘুম থেকে জেগে কোন কিছু পানাহার করা ও স্ত্রী সহবাস করতে পারবেনা। পরবর্তীতে আবু কায়েস ‎বিন সারমা রাঃ সহ কিছু সাহাবী আবেদন করলে আল্লাহ তায়ালা সহজতার আয়াত নাজিল করে জানিয়ে ‎দিলেন সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত রোযা নেই। পর থেকে রোযা শুরু। (তাফসীরে তাবারী-৩/৪০৯) ‎

খোদাভীরু হবার মাস মাহে রামাযান

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন আমি তোমাদের উপর রোযা ফরয করেছি যেন তোমরা মুত্তাকী তথা খোদাভীরু ‎হতে পার। রোযার মাধ্যমে একজন বান্দা খোদাভীরু এভাবে হয় যে, একাকি চুপটি ঘরে রোযাদার যখন ‎থাকে তখন সে ইচ্ছে করলেই পানাহার করতে পারে কিন্তু সে এ থেকে কেবল বিরত থাকে আল্লাহর ‎আদেশ অমান্য হয়ে যাবার ভয়ে, একাজটি সে করে থাকে শুধু আল্লাহর ভয়ে, কারণ সেখানেতো কোন ‎মানুষ তাকে দেখছেনা। সুতরাং রোযা রাখাটাই খোদাভীরুতার একটি পরিচায়ক। সুতরাং রামাযানে এই ‎প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্য সময়ে যেন বান্দা কোন গোনাহ করতে আল্লাহ দেখছেন এই ভয়ে বিরত থাকে এর ‎একটি প্রশিক্ষণও এই রামাযান। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন তোমরা মুত্তকী হবার জন্য আমি রোযাকে ফরয ‎করেছি।

রামাযানের ফযীলত

عن أبي هريرة : قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم إذا كان أول ليلة من شهر رمضان صفدت الشياطين ومردة الجن ‏وغلقت أبواب النار فلم يفتح منها باب وفتحت أبواب الجنة فلم يغلق منها باب وينادي مناد يا باغي الخير أقبل ويا باغي ‏الشر أقصر ولله عتقاء من النار وذلك كل ليلة قال وفي الباب عن عبد الرحمن بن عوف و ابن مسعود و سلمان ‏
قال الشيخ الألباني : صحيح ‏

অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ বলেছেন-যখন রামাযানের প্রথম রাত আসে ‎তখন শয়তান ও জীনদের পায়ে বেড়ি পড়ানো হয়। এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়, তাই ‎জাহান্নামের কোন দরজা খোলা থাকেনা, ও জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়, এমনকি জান্নাতের কোন ‎দরজা বন্ধ থাকেনা। আর একজন আহবানকারী ডাকতে থাকে-হে কল্যাণ প্রার্থী! এগিয়ে এসো! আর ‎মন্দতাপ্রার্থী! তুমি ফিরে যাও! আর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অনেক গোনাহগারকে জাহান্নাম থেকে ‎মুক্তি দেয়া হয়।(অর্থাৎ তার ক্ষমার সীদ্ধান্ত গৃহিত হয়।) (তিরমিজি শরীফ-রামাযান অধ্যায়)‎
عن أبي هريرة : قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من صام رمضان وقامه إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه ومن ‏قام ليلة القدر إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه ‏
অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন-যে ব্যাক্তি ঈমানের সাথে ও ‎পূণ্যের আশায় রামাযানের রোযা রাখে আর ঈমানের সাথে পূণ্যের আশায় শুয়ার পূর্বে নফল(তারাবীহ) ‎পড়ে তার পূর্বের সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। আর ঈমানের সাথে পূণ্যের আশায় শবে কদরে নফল ‎পড়ে তার পূর্বের সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (তিরমিজী শরীফ-রামাযান অধ্যায়)‎

সেহরীর ফযীলত

أنس بن مالك رضي الله عنه قال : قال النبي صلى الله عليه و سلم ( تسحروا فإن في السحور بركة ) ‏
অনুবাদ-হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন-তোমরা সেহরী খাও কেননা সেহরীতে ‎বরকত নিহিত। (বুখারী শরীফ-২/৬৭৮)‎
عن عمرو بن العاص أن رسول الله -صلى الله عليه وسلم- قال فصل ما بين صيامنا وصيام أهل الكتاب أكلة السحر
অনুবাদ-হযরত আমর বিন আস থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন-আমাদের ও আহলে কিতাবীদের ‎মাঝে রোযার মাঝে পার্থক্য নির্ণায়ক হল সেহরী খাওয়া। (মুসলিম শরীফ-৩/১৩০)‎

বান্দাদের পূণ্য আর গোনাহমুক্তির ক্ষেত্রে বোনাসময় মাস

গোনাহগার বান্দাদের গোনাহ মাফের ব্যাপকতার জন্য এ মাস এক বিশাল সুযোগের মাস। রামাযানের ‎শুরু থেকেই গোনাহ মাফের যে অফার শুরু হয় তা থাকে ঈদের চাঁদ উঠা পর্যন্ত। একবার কোন ইবাদাত ‎করলে অন্য মাসে ৭০ বার সে ইবাদাত করার সোয়াব পাবার নিশ্চয়তা। সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহর ‎অবারিত মাগফিরাত আর বরকতপূর্ণ এ মাস। এ মাসে যেন আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা আর বরকতের ঝাঁপি ‎খুলে দিয়েছেন। ‎

من تقرب فيه بخصلة من الخير كان كمن أدى فريضة فيما سواه و من أدى فيه فريضة كان كمن أدى سبعين فريضة فيما سواه ‏‎ ‎
অনুবাদ-সালমান রাঃ থেকে বর্ণিত একদা নবীজী সাঃ খুতবায় বলেন-যে ব্যক্তি এ মাসে (নফল) নেক ‎আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় হবে যে রামাযান ছাড়া অন্য সময় ‎একটি ফরয আদায় করল, আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করবে সে যেন অন্য মাসের সত্তরটি ‎ফরয আদায় করল। (সহীহ ইবনে খুজাইমা-৩/১৯১)‎

আহবান

প্রিয় পাঠক/পাঠিকারা! আসুন রহমত বরকত মাগফিরাতে পূর্ণ এই পবিত্র মাসটি আমরা এবার অন্য সময়ের ‎তুলনায় পবিত্র ও সুন্দর করে পালন করি। তারাবিহ-তাহাজ্জুদ, সেহরী-ইফতার, জিকির-তাসবীহ, প্রথম ‎ওয়াক্তে-জামাতে নামায পড়া ইত্যাদীর মাধ্যমে এ রামাযানটি পালন করি পূর্ণাঙ্গ আনুগত্বের সাথে। সাথে ‎সাথে সকল প্রকার গোনাহ ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত থাকি দৃঢ়তার সাথে। আল্লাহ তায়ালা আমাদের এ ‎পবিত্র মাসে ইবাদত করে তার প্রিয় বান্দা হবার তৌফিক দান করুন। সাথে সাথে যারা এ মাসে নিজের ‎গোনাহকে মাফ করাতে না পারে তাদের ক্ষেত্রে হযরত জিবরাঈল আঃ যে অভিশাপ করেছেন যে ব্যক্তি এ ‎মাসে গোনাহ মাফ করাতে না পারে সে ব্যক্তি সবচে দূর্ভাগা নবীজী সাঃ যে বদদুআর প্রদুত্তরে ‎বলেছেন আমীন, সেই মকবুল বদ দুআকৃত ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত না হতে আল্লাহ তায়ালা আমাদের হিফাযত ‎করুন। আমীন।

লুৎফর ফরাজী সত্র: ইন্টারনেট
সবটুকু একত্রে পড়ুন "মাহে রামাযান সম্পর্কে কিছু কথা"

বেদ সম্পর্কে কিছু কথা

বেদ হল পৃথিবীর প্রাচীন গ্রন্থ গুলির মধ্যে একটি এবং হিন্দুদের প্রধান ধর্মগ্রন্থ । বেদ যে আসমানি গ্রন্থ এ ব্যাপারে অনেক বিশেষজ্ঞ অভিমত দিয়েছেন । আমরা জানি আল্লাহ তা’আলা চার খানা প্রধান আসমানি গ্রন্থ (কুরান, ইঞ্জিল,যবুর ও তাওরাত) ও একশ খানা সহিফা গ্রন্থ নাযিল করেন । তাঁদের মতে বেদ এই সহিফা গ্রন্থ গুলোর মধ্যে পড়ে ।


আমরা জানার চেষ্টা করব ইশ্বর সম্পর্কে বেদ কি বলে । হিন্দুরা অনেক দেব দেবির পুজা করলেও হিন্দু ধর্ম গ্রন্থ গুলোর মতে হিন্দুদের কেবল মাত্র এক জন ইশ্বের পুজো করা উচিত ।বেদের ‘ব্রহ্ম সুত্র’ তে আছে “একম ব্রহ্মা দ্বৈত্য নাস্তি নহিনা নাস্তি কিঞ্চন” অর্থাৎ ইশ্বর এক তাঁর মত কেউ নেই কেউ নেই সামান্যও নেই । আরও আছে “তিনি একজন তাঁরই উপাসনা কর” (ঋকবেদ ২;৪৫;১৬) । “একম এবম অদ্বৈত্তম” অর্থাৎ তিনি একজন তাঁর মত আর দ্বিতীয় কেউ নেই (ঋকবেদ ১;২;৩) । “এক জনেই বিশ্বের প্রভু” (ঋকবেদ ১০;১২১;৩) ।
এছাড়াও অনেক জোর দিয়ে বলা হয়েছে --


“ন দ্বিতীয়, ন তৃতীয়, চতুর্থ ন পুচ্যতে


ন পঞ্চম, ন ষষ্ট, সপ্ত্য ন পুচ্যতে ।


ন অষ্টম, ন নবম, দশমো ন পুচ্যতে


য এতং দেভ মেক বৃতং বেদ” ।। (অথর্ব বেদ। সুক্ত ১৪;৪;২)


অর্থাৎ ‘পরমাত্তা এক। তিনি ছাড়া কেহই দ্বিতীয়, তৃতিয় বা চতুর্থ, পঞ্চম, ষষ্ট বা সপ্তম, অষ্টম নবম বা দশম বলে বলিয়া অবিহিত আর কেহ নাই । যিনি তাহাকে এক বলিয়া যানেন তিনিই তাঁহাকে প্রাপ্ত হন’ । শ্রীমদ্ভগবদ গীতায় আছে-‘আমার আদি নাই, জন্ম নাই । আমি সকল জগতের প্রভু, আমার এই স্বরুপ যিনি জানেন, তিনি এই জিগতের সকল পাপ হইতে মুক্ত’ (গীতা, দশম অধ্যায়, শ্লোক/৩৭) ।এছাড়াও আছে ‘হে মহাত্মা তুমি ব্রহ্মার চেয়েও বড়, তুমি সৃস্টিকর্তা তাই তমাকে তাঁরা সকলে প্রনাম করিবে না কেন ? হে শ্রেষ্ট দেবতা, হে অনন্ত, হে জগতের আশ্রয়! তুমি ব্যক্ত ও অব্যক্ত ও ব্যক্ত ও অব্যক্তের অতীত যে পরম ব্রহ্মা তাঁহাই তুমি’ (গীতা, দশম অধ্যায়, শ্লোক ৩৭-৩৮) ।


সৃস্টিকর্তা এক এ সম্পর্কে আরও অনেক অনেক শ্লোক আছে তবে উপরের শ্লোক গুলোই যথেষ্ট এতা প্রমান করার জন্ন যে হিন্দু ধর্মে একেইশ্বরবাদ স্বীকৃত । যেহেতু হিন্দু ধর্ম প্রাচীন ধর্ম, এবং সবার শাস্ত্র পড়ার অধিকার ছিল না তাই সেই সময় কার কিছু ঋষিমুনির কারনে মুর্তি পুজোর উদ্ভব হয়েছে । এই প্রসঙ্গে ডা. চমনলাল গৌতম তাঁর বিষ্ণুরহস্য বই এর ১৪৯ পৃষ্ঠায় লিখেছেন-‘ঋষিগন মুর্তি পুজা প্রচলিত করেছেন যাতে সেই মুর্তির মাধ্যমে সেই অসিম সত্তাকে দৈহিক আকৃতিতে নিজের সামনে দেখতে পায়’ । ইশ্বর যে নিরাকার তাঁর কোনো রুপ নেই, আকার নেই, হাত পা নেই তা ঋকবেদের এই শ্লোক থেকে বোঝা যায়-‘ন তস্য প্রতিমা অস্তি’ (৩২;৩) ।অর্থাৎ সেই পরমেশ্বরের কোনো আকার হয় না । এছাড়া বেদ মুর্তি পুজা করতেও নিষেধ করে । বেদ বলে- যে ব্যক্তি অলীক দেব দেবীর পুজা করে, সে দৃষ্টি হরনকারী গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যায়’(ঋকবেদ-৫;২;৫)।আরও আছে ‘যারা সম্ভুতির (অর্থাৎ যা আল্লাহর সৃষ্টি যেমন জল, বাতাস, সুর্য ইত্যাদি) পুজা করে তারা অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে । আর যারা অসম্ভুতির পুজা করে তারা আরো অন্ধকারের দিকে যাচ্ছে’ (ঋকবেদ) ।


হিন্দু ধর্মে যত ইশ্বরের নাম দেওয়া হয় সেগুলো আসলে এক জন ইশ্বরেরই গুনবাচক নাম । তাঁরই নাম ব্রহ্মা, তাঁরই নাম বিষ্ণু, তিনিই ইন্দ্র তিনিই সরস্বতি । বেদ থেকে তার সুস্পষ্ট প্রমান পাওয়া যায় । নিচে এ সম্পর্কে কয়েকটি শ্লোক দেওয়া হল --- “হে অগ্নি! তুমিই পুণাত্মাদের মনস্কামনা পুর্ণকারী ইন্দ্র । তুমিই উপাসনা লাভের অধিকারী । তুমিই বহুজনের প্রশংসিত বিষ্ণু । তুমিই ব্রহ্মা ও ব্রহ্মপতি” (ঋকবেদ- ২;১;৩) । “হে অগ্নি! তুমিই পুণ্যের ভান্ডার । তুমিই এঢ়া তুমিই সরস্বতি” (প্রাগুক্ত ২;১;১১) । “হে অগ্নি! তুমিই সম্পদ দানকারী সবিতা । তুমিই বায়ু উপাসকদের রক্ষাকারী” (প্রাগুক্ত ২;১;৭) । “হে অগ্নি! তুমিই কর, তুমিই পুষা । নিকটবর্তী আকাশের রক্ষাকারী শংকর”(প্রাগুক্ত ২;১;৬) । হে অগ্নি! তুমিই প্রতিশ্রুতি পুর্ণকারী বরুন । তুমিই প্রশংসনিয় মিত্র । তুমি আসলে নেতা আর‌্যাম” (প্রাগুক্ত ২;১;৪) ।


বেদ থেকে এরুপ সুস্পষ্ট প্রমানের পর বিভিন্ন নামে পুজিত হাজারো দেবতার ধারনা একেবারেই খারিজ হয়ে যায়।তবে ডা. চমনলালের কথা মেনে নিলে এটা বলা যেতে পারে যে বিভিন্ন ঋষিমুনি ইশ্বরের বিভিন্ন আকার বা মুর্তি তৈরি করায় আজ ইশ্বরের এত গুলো মুর্তির সৃষ্টি হয়েছে । এক ইশ্বর ছাড়া অন্য কোনো ইশ্বর নাই ।তাঁর অনেক সুন্দর সুন্দর নাম আছে । তবে তাঁর বিভিন্ন নাম কে বিভিন্ন ভগবান মনে করা বোকামী । উপরের শ্লোক গুলো থেকে এটাই প্রমানিত হলো ।বেদে আছে –“(ইন্দ্র, বরুন, সরস্বতি, মিত্র, অগ্নি, যম, বায়ু, বিষ্ণু প্রভৃতি) একই শক্তির বিভিন্ন নাম । দৃষ্টিবানেরা ও জ্ঞানীরা গুনের ভিত্তিতে ইশ্বরকে বিভিন্ন নামে আহ্ববান করে থাকেন” (প্রাগুক্ত ১০;১১৪;৫) ।এই সকল প্রমানের পরও যদি কেউ সে কথা মেনে না চলেন তাহলে তারা নির্বোধ ছাড়া আর কিছুই নয় । কারন বেদে বলা হয়েছে “ উৎ ত্বঃ পশ্যন্ম বাচম, উৎ ত্বঃ শৃরাবন্ম শ্রনোত্যে নাম’ (ঋকবেদ ১০;৭১;৪) । অর্থাৎ নির্বোধ লোকেরা গ্রন্থ দেখেও দেখে না, শুনেও শুনে না ।
সবটুকু একত্রে পড়ুন "বেদ সম্পর্কে কিছু কথা"

ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল উপার্জন

হালাল বলতে আমরা সাধারণত: যাবতীয় বৈধ পন্থাকেই বুঝি। যা কল্যানকর ও হিতকর এবং যাবতীয় অবৈধ ও অকল্যাণকর হতে মুক্ত। ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব অপরিসীম। মহান আল্লাহ মানব জাতিকে উপার্জনের জন্যে উৎসাহ দিয়েই ক্ষান্ত হননি; বরং যাবতীয় বৈধ ও অবৈধ পন্থাও বাতলে দিয়েছেন। অতএব হালাল উপার্জন বলতে বুঝায় উপার্জনের ক্ষেত্রে বৈধ ও শরী‘আত সম্মত পন্থা অবলম্বন।
হালাল উপায়ে জীবিকা উপার্জনের ফলে সমাজ ব্যবস্থায় ধনী দরিদ্রের মাঝে সুষম ভারসাম্য ফিরে আসে; কৃষক দিন মজুর, ক্রেতা-বিক্রেতা, শ্রমিক-মালিক এবং অধস্তনদের সাথে উর্ধ্বতনদের সুদৃঢ় ও সংগতিপূণ সর্ম্পক তৈরী হয়। ফলে সকল শ্রেণীর নাগরিকই তাদের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পায় এবং সমাজ সংসারে নেমে আসে শান্তির সুবাতাস।
মূলত: ইসলাম যে পেশাকে অবৈধ বলে ঘোষনা করেছে সেসব পন্থায় উপার্জন ব্যতীত অন্যান্য পন্থায় উপার্জন করা বৈধ বলে বিবেচিত। ইসলাম প্রদত্ত সীমারেখা ও মূলনীতি ঠিক রেখে বৈধ যে কোন পণ্যের ব্যবসা করার মাধ্যমে উপার্জনকে ইসলামী শরী‘আত হালাল হিসেবে আখ্যা দিয়েছে। এছাড়া যদি কেউ বৈধ উপায়ে যোগ্যতানুযায়ী চাকুরী করে এবং ঘুষ সহ যাবতীয় অবৈধ লেন-দেন ও অসৎ মানসিকতা থেকে দুরে থাকে তবে সেটাও জীবিকার্জনের হালাল পন্থা হিসেবে সাব্যস্ত হবে।
মহান আল্লাহ মানুষকে তাঁর ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। এটি শুধুমাত্র পাঁচ ওয়াক্ত নামায, রোযা, যাকাত প্রভৃতির উপরই সীমাবদ্ধ নয়। জীবন ব্যবস্থার পূর্ণাঙ্গ রূপ রেখার প্রণেতা হিসেবে ইসলামে রয়েছে জীবন ধারনের যাবতীয় বিষয় সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক নির্দেশনা। এ দৃষ্টিকোন থেকে বিচার করলে হালাল উপায়ে উপার্জনের ব্যবস্থা গ্রহণও অন্যতম একটি মৌলিক ইবাদত। শুধু তাই নয়, ইসলাম এটিকে অত্যাবশ্যক (ফরয) কাজ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।
এ মর্মে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর একটি হাদীস প্রনিধানযোগ্য। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«كسب الحلال فريضة بعد الفريضة »
‘‘ফরয আদায়ের পর হালাল পন্থায় উপার্জনও ফরয।’’
উপর্যুক্ত হাদীসের মাধ্যমে প্রতিভাত হয় যে, ইসলামে হালাল উপার্জনের গুরুত্ব কতখানি এবং কোন ব্যক্তি যেন হারাম কোন পেশা অবলম্বন না করে উপরোক্ত হাদীসে সে মর্মেও অর্ন্তনিহীত নির্দেশ রয়েছে। পরকালীন জীবনে এ ফরয ইবাদতটি সম্পর্কে যে মানুষকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে তার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। কেননা যাবতীয় ফরয সম্পর্কে বান্দা জিজ্ঞাসিত হবে। অতএব এটি ফরয কাজ সমূহের অন্তর্গত এক মৌলিক অত্যাশ্যকীয় ইবাদতে গণ্য হয়েছে।
উপার্জনের ক্ষেত্রে ইসলাম যেসব পন্থাকে হালাল করেছে সেগুলোর মূলনীতিসহ সংক্ষিপ্ত বিবরণ নিম্নে দেয়া হলো:
১.১ ব্যবসা বাণিজ্য
উপার্জনের ক্ষেত্রে ব্যবসা-বাণিজ্য সব চেয়ে বড় সেক্টর। ইসলামের দৃষ্টিতে এটি একটি মহৎ পেশা। সমাজ জীবনে যার ক্রিয়াশীলতা ও প্রভাব অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ও সুদূঢ় প্রসারী। ইসলাম ব্যবসা-বাণিজ্যকে শুধু বৈধ বলেই ক্ষান্ত হয়নি; বরং এ ব্যাপারে সবিশেষ উৎসাহ ও গুরুত্ব প্রদান করেছে। যেন মুসলিম উম্মাহ পৃথিবীর বুকে একটি শ্রেষ্ট জাতি হিসেবে অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধি ও স্বয়ং-সম্পূর্ণতা অর্জন করতে পারে। মহান আল্লাহ বলেন:
﴿وَأَحَلَّ ٱللَّهُ ٱلۡبَيۡعَ وَحَرَّمَ ٱلرِّبَوٰاْۚ﴾[البقرة:275]
‘‘তিনি (আল্লাহ) ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।’’
উপরোক্ত আয়াতের মর্ম উপলব্দিতে প্রতীয়মান হয় যে, সুদভিত্তিক লেন-দেনের মাধ্যমে যারা পৃথিবীতে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করছে তাদের মুকাবিলায় মহান আল্লাহ ব্যবসা-বাণিজ্যকে বৈধ বলে ঘোষনা দিয়েছেন। অতএব অবৈধ পন্থা হতে বাঁচার এবং প্রাচুর্য ও সমৃদ্ধি লাভের এটি অনেক বড় অবলম্বণ। এছাড়াও জীবিকার একটি বৃহৎ অংশ রয়েছে এ ব্যবস্থাপনায়। মুরসাল হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,
«عليكم بالتجارة فإن فيها تسعة أعشار الرزق»
‘‘তোমরা ব্যবসা বানিজ্য কর। কারণ তাতেই নিহিত রয়েছে নয়-দশমাংশ জীবিকা’’
তাছাড়া সততা, বিশ্বস্ততা, ন্যায়পরায়নতা, ধোঁকামুক্ত, কল্যাণমুখী মানসিকতাসম্পন্ন ব্যবসায়ীদের প্রশংসায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনেক হাদীস বিদ্যমান। এ ধরনের ব্যবসায়ীকে তিনি নবীগণ, ছিদ্দিক, ও শহীদদের সমমর্যাদাপূর্ণ বলে উল্লেখ করেছেন। তিনি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«التاجرالصدوق الأمين مع النبيين والصديقين والشهداء»
‘‘সৎ ও ন্যায়পরায়ণ ব্যবসায়ী (পরকালে) নবী, সিদ্দিকীন ও আল্লাহর পথে জীবন বিসর্জনকারী শহীদদের সঙ্গী হবে।
ব্যবসা-বাণিজ্যের ক্ষেত্রে ইসলাম যেসব মূলনীতি দিয়েছে তাহলো: ধোঁকা ও প্রতারনামুক্ত, মিথ্যার আশ্রয় বিহীন, পণ্যের দোষ - গুণ স্পষ্ট থাকা, ভাল পণ্যের সাথে খারাপ পণ্যের মিশ্রণ না করা, মুনাফাখোরী মানোবৃত্তি পরিহার করে কল্যাণমুখী মানষিকতা পোষণ, মজুদদারি চিন্তা-চেতনা পোষণ না করা, ওজনে হের-ফের না করা, সর্বোপরি যাবতীয় শঠতা ও জুলুম থেকে বিরত থাকা।
১.২. চাকুরী
এটি জীবিকা নির্বাহে উপার্জনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে পরিগণিত। জনসংখ্যার একটা উল্লেখযোগ্য অংশ আমাদের দেশে সরকারী আধা-সরকারী, বেসরকারী, ব্যাংক-বীমা, এন.জি.ও. ও ব্যক্তিমালিকানাধিন এবং স্বায়ত্বশাসিত বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকুরী করে। এসব চাকুরীর ক্ষেত্রে ইসলামের মূল দর্শন হলো প্রত্যেক চাকুরে তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব পূর্ণ নিষ্ঠা, আন্তরিকতা ও সচ্ছতার সাথে পালন করবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ বিষয়ের মূলনীতি বর্ণনা করতে গিয়ে বলেন:
«كلكم راع، وكلكم مسئول عن رعيته »
‘‘তোমাদের প্রত্যেকেই এক একজন দায়িত্বশীল। তোমাদের প্রত্যেককে নিজ নিজ দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’’
তবে এক্ষেত্রে অবশ্যই সকলকে যাবতীয় অনিয়ম, দুর্নীতি যেমন ঘুষ গ্রহণ, স্বজনপ্রীতি অন্যায়ভাবে কাউকে সুযোগ সুবিধা (undue Facilities) দান, কারো প্রতি জুলুম করা প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে। কেননা এসব অনিয়ম ও দুর্নীতি-পরায়ণদের অশুভ পরিণতি সম্পর্কে ইসলামের সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। এছাড়াও কর্তব্যে অবহেলা, অনিয়মানুবর্তিতা ও কার্যে উদাসীনতার দরুন চাকুরীজীবিদের উপার্জন অনেক সময় বৈধতা হারিয়ে ফেলে। আমাদের দেশে দেখা যায় অনেক স্কুল-কলেজের শিক্ষক শ্রেণীকক্ষে পাঠ দানের পরিবর্তে টিউশনী ও কোচিং সেন্টারের প্রতি বেশী ঝুকে পড়েছেন। অনেক ডাক্তার হাসপাতালে রোগী না দেখে ক্লিনিকে জমজমাট ব্যবসা শুরু করে দিয়েছেন। যা কর্তব্যে অবহেলার নামান্তর। তারা যদি স্বীয় দায়িত্ব যথাযথ ও পূর্ণভাবে পালন করার পর অতিরিক্ত সময় এসব কাজ করেন তবে তা দোষের নয়।
১.৩.কৃষিকর্ম
কৃষিকর্ম জীবিকা নির্বাহে অন্যতম উপার্জন মাধ্যম। ইসলাম এটিকে মহৎ পেশা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। কৃষিকার্যের সুচনা হয়েছে আদিপিতা আদম আলাইহিস সালাম থেকেই তাঁকে কৃষি কার্য, আগুনের ব্যবহার ও কুটির শিল্প শিক্ষা দেয়া হয়েছিল। পর্যায়ক্রমে এ ব্যবস্থার উন্নতি সাধিত হয়েছে। পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহ মানবজাতির কল্যাণে এ ব্যবস্থাকে সাব্যস্ত করেছেন।
বাংলাদেশ একটি কৃষি প্রধান দেশ। এদেশের অধিকাংশ লোকই কৃষি নির্ভর জীবিকা নির্বাহ করে। অথচ ইসলামের কৃষিনীতি সম্পর্কে অবগত হয়ে যদি কেউ তাঁর এ ব্যবস্থাপনায় ইসলামী নীতি অনুসরণ করে তবেই তা হালাল উপার্জন হবে। আর সেগুলো হলো:
ক. ভূমির মালিক নিজেই চাষ করবে। এ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন:
«من كانت له أرض، فليزرعها»
‘‘যার জমি রয়েছে সে নিজেই চাষাবাদ করবে।’’ তবে এক্ষেত্রে কারো জমি অন্যায়ভাবে অধিকারে আনে কিংবা উত্তরাধিকারকে অংশ না দিয়ে চাষ করলে গুরুতর অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হবে।
অথবা, মজুরের দ্বারা নিজের তত্বাবধানে চাষ করবে অথবা কোন ভূমিহীনকে চাষাবাদ ও ভোগদখল করতে দিবে।

খ. উৎপন্ন ফসলের নির্দিষ্ট অংশ দেয়ার শর্তে কাউকে চাষ করতে দেয়া।
গ. প্রচলিত বাজার দর অনুযায়ী নির্দিষ্ট পরিমাণ নগদ টাকার বিনিময়ে কাউকে এক বছরের জন্য তার ভোগাধিকার দান করা।
ঘ. জমিতে হারাম দ্রব্য উৎপাদন না করা, যাতে ক্ষতিকর কোন উপাদান রয়েছে্ যেমন: আফিম, গাঁজা, চারস বা অনুরূপ মাদক দ্রব্য।
ঙ. অংশীদারিত্ব চাষাবাদ যাবতীয় প্রতারণা, ধোঁকা, ঠকবাজি, ও অজ্ঞতা থেকে মুক্ত থেকে ন্যায়পরায়নতা ও ইনসাফ ভিত্তিক নীতির লালন করতে হবে।
আল্লামা মাওয়ারদী উল্লেখ করেছেন যে, উৎপাদনের মূল উপাদান দু’টি, এক. কৃষি, দুই. ব্যবসা-বানিজ্য। তবে এদুয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ ও পবিত্রতম হলো কৃষি।
ইসলামে মানুষের অর্থ-সম্পদ লাভের তিনটি নৈতিক পন্থা নির্ধারন করে দেয়া হয়েছে।
আর তা হলো:
১. পরিশ্রম:
পরিশ্রমের মাধ্যমে মানুষ অর্থ সম্পদ উপার্জন করতে পারে। সে সঙ্গে মেধা ও যোগ্যতার সমন্বয়ে মানুষ অর্থের পাহাড় গড়তে সক্ষম হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন আল্লাহর নিকট ঐ জীবিকাই উত্তম যা মানুষ নিজ হাতে উপার্জন করে। এভাবে শ্রমদানের ক্ষেত্রও বহুবিধ ও বিচিত্র ধরনের। তন্মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো:
১. শিল্পকর্ম:
ব্যবসা-বাণিজ্যের পাশাপাশি শিল্পকর্মও মানুষের অন্যতম পেশা। এ মহতি পেশায় জনসংখ্যার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ নিয়োজিত রয়েছে। এ কর্মটি সম্পর্কে ইসলাম যথেষ্ট গুরুত্বরোপ করেছে। যুগে যুগে প্রেরিত নবী-রাসূলগণ শুধু উৎসাহের বানী প্রদান করেই ক্ষান্ত হননি; বরং শিল্প ও ব্যবসার ময়দানে তাদের বিশাল অবদান রয়েছে। পবিত্র কুরআনে ইরশাদ হয়েছে:
﴿وَعَلَّمۡنَٰهُ صَنۡعَةَ لَبُوسٖ لَّكُمۡ لِتُحۡصِنَكُم مِّنۢ بَأۡسِكُمۡۖ فَهَلۡ أَنتُمۡ شَٰكِرُونَ ٨٠﴾ [الأنبياء: 80]
‘‘আমি তাঁকে (দাউদ আলাইহিস সালাম) বর্ম নির্মাণ শিক্ষা দিয়েছিলাম যাতে তা যুদ্ধে তোমাদেরকে রক্ষা করে।’’
শিল্প শিক্ষাকে মহান আল্লাহ নিয়ামত হিসেবে অভিহিত করেছেন এবং এ-জন্য শুকরিয়া আদায় করার নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর নবীগণ কোন না কোন শিল্পকর্মে নিয়োজিত ছিলেন। উপরোক্ত আয়াতে দাউদ আলাইহিস সালাম বর্ম শিল্পে নিয়োজিত ছিলেন বলে আভাস রয়েছে। এছাড়াও তিনি প্রথম জীবনে চাষী হিসেবে কাজ করেছেন। তিনি শষ্য বপন ও কর্তন করতেন। মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘‘যে জমি মানুষের খিদমতের জন্য কোন কাজ করে তাঁর দৃষ্টান্ত মূসা আলাইহিস সালাম জননীর ন্যায়। তিনি নিজে সন্তানকে দুধ পান করিয়েছেন; আবার ফেরাউনের কাছ থেকে পাবিশ্রমিক পেয়েছেন। এছাড়া মূসা আলাইহিস সালাম মাদইয়ানে ৮ বছর চাকরী করছেন, নূহ আলাইহিস সালাম জাহাজ নির্মান করেছেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম কাঠমিস্ত্রির কাজ করতেন। বিশ্বনবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাল্যকালে ছাগল চরাতেন, যৌবনে ব্যবসা করেছেন, চাকরী করেছেন, খন্দকের যুদ্ধে মাটি কেটেছেন, মাথায় বোঝা বহন করেছেন। কূপ থেকে পানি তুলেছেন, নিজ হাতে জামা ও জুতা সেলাই করেছেন, স্ত্রীকে ঘরে রান্নার কাজে সাহায্য করেছেন, এমনকি দুধ দোহনও করেছেন। এজন্য পেশা ক্ষুদ্র হোক, বৃহৎ হোক, তাতে কিছু আসে যায় না। নিজে পরিশ্রম করে শ্রমলব্দ আয়ে নিজের পরিবারবর্গের আস্বাদনের জন্য সংগ্রাম করা অতিশয় সম্মান ও পূণ্যের কাজ।
২. উত্তরাধিকার:
উত্তরাধিকারসূত্রে মানুষ অর্থ সম্পদ লাভ করে থাকে। কোন ব্যক্তির মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিগণ ইসলামের বিধান অনুযায়ী মৃতের পরিত্যক্ত স্থাবর, অস্থাবর সম্পত্তি হতে যে সম্পদ লাব করে থাকে তা হালাল।
৩. হেবা বা দান:
কোন বিনিময় মূল্য বা প্রতিদান ব্যাতিরেকে কাউকে নিজের সম্পদের মালিকানা হস্তান্তর বা দান করা এবং যার অনুকুলে হস্তান্তর বা দান করা হয় সে ব্যাক্তি কর্তৃক তা গ্রহণ করাকে হেবা বলা হয়। হেবার মাধ্যমে অর্জিত অর্থ সম্পদ হালাল।

সূত্র: ইন্টারেনট থেকে অনুদিত ও সংকলিত।

সবটুকু একত্রে পড়ুন "ইসলামের দৃষ্টিতে হালাল উপার্জন"

মাহে রমাযান ও রোযার ফযীলত

রোযা ফারসী শব্দ, আরবী সিয়াম বা সাওম। এর আভিধানিক অর্থ বিরত থাকা। শরীয়তের দৃষ্টিতে সিয়াম অর্থ সোবেহ সাদেক হতে সুর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার, যৌন সম্ভোগ ও শরীয়াত নির্ধারিত বিধি-নিষেধ হতে নিয়তসহ বিরত থাকাকে রোযা বলে। শরীয়াতে ঈমান, সালাত ও যাকাতের পরেই রোযার স্থান। ইহা ইসলামের চতুর্থ রোকন। আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধনে ইহা একটি অপরিহার্য ইবাদত। বস্তুত রোযা মানুষকে কু-প্রবৃত্তি থেকে রক্ষা করে, রাসূল (সা.) বলেন; রোযা ঢাল স্বরূপ। রোযা কেবল মহান আল্লাহর সন্তুষ্টি বিধানের জন্যেই রাখা হয়। এ কারণে রোযাদারদেরকে আল্লাহ অত্যাধিক ভালবাসেন। হাদীসে কুদসীতে এসেছে আল্লাহ বলেন; রোযা একমাত্র আমারই জন্য আমি নিজেই এ পুরস্কার দেব। কুরআনে শুধু রোযা রাখার হুকুমই হয়নি, বরং রোযার নিয়ম পদ্ধতিও বলে দেয়া হয়েছে, রমযানের মহাত্ম ও বরকত সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। যে মাসের রোযা শরীয়ত ফরজ করেছে তার ফযীলত ও বরকত অনেক। এ কারণেই রাসূলে কারীম (সাঃ) এ মাসকে শাহরুল্লাহ বা আল্লাহর মাস বলে আখ্যায়িত করেছেন এবং এ মাসকে সকল মাস অপেক্ষা উৎকৃষ্টতম বলেছেন।

আমরা জানি পৃথিবীর সব দেশের মানুষই বার মাসে বছর হিসাব করে, কিন্তু এই বার মাসের মধ্যে একটি মাসের গুরুত্ব এতো বেশি কেন? কোন কারণে এই মাসকে আল্লাহর মাস বলা হয়। মূলত এই মাসের সম্মান মর্যাদা গুরুত্ব ফযীলত বরকত নাজাত মাগফিরাত একমাত্র কুরআন এর সম্মানের কারণে হয়েছে। কুরআন যদি এই মাসে নাযিল না হতো তাহলে এই রমযান মাসের এত ফযীলত হতো না। যার কারণে প্রত্যেক এবাদতের গুণ এত বৃদ্ধি পেল, তাকে আজ আমরা বুঝার চেষ্টা করি না। তার সাথে আমরা ভাল ব্যবহার করি না । তাকে দিয়ে নিজ , পরিবার, সমাজ, রাষ্ট্র, এক কথায় কিছুই পরিচালনা করি না। অথচ আমরা রমযান মাসের প্রতিটি দিনই রোযা রাখি। আসলে কুরআনকে সঠিক নিয়মে বুঝার জন্যই এ মাসকে নির্দিষ্ট করা হয়েছে, মহান আল্লাহ তায়ালা বলেন; রমযান মাস যার মধ্যে বিশ্বমানবের জন্য পথপ্রদর্শক এবং সু-পথের উজ্জ্বল নিদর্শন ও প্রভেদকারী কুরআন অবর্তীণ হয়েছে। (সূরা বাকারা ১৮৫)
রমযানের রোযা পালন ফরজ, মহান আল্লাহ তা’য়ালা এরশাদ করেন, “হে ঈমানদারগণ তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে যেমন তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরজ করা হয়েছিল, ফলে আশা করা যায় যে তোমাদের মধ্যে তাকওয়ার গুণ ও বৈশিষ্ট্য জাগ্রত হবে।” অর্থাৎ তোমরা মুত্তাকী হতে পারবে। (সূরা বাকারা : ১৮৩)
উপর্যুক্ত আয়াত শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা বর্ণনার জন্য নয় বরং এ গুরুত্বপূর্ণ সত্যটি তুলে ধরার জন্য যে, মানুষের প্রবৃত্তির পরিশুদ্ধির সাথে রোযার বিশেষ সম্পর্ক রয়েছে এবং তাযকিয়ায়ে নফসে তার একটি স্বাভাবিক অধিকার রয়েছে। রোযার গুরুত্ব বর্ণনা করতে গিয়ে রাসূল (সাঃ) বলেন- “যে ব্যক্তি কোন শরয়ী ওযর বা রোগ ছাড়া রমযানের একটি রোযা ছেড়ে দিবে সে যদি সারা জীবন ধরে রোযা রাখে তবুও তার ক্ষতি পূরণ হবে না”।

প্রকৃত পক্ষে রমযান এসেছে বান্দাকে তাকওয়া শিক্ষা দেওয়ার জন্য। সারা বছর মানুষ শয়তানের কুআচরনের কারণে কিছু না কিছু গুনাহ করে থাকে। রোযার এক মাসে সাধনা করলে ঐ সমস্ত গুনাহ মাফ হয়ে যায়। এই তাকওয়া আসলে এমন এক সম্পদ যা আল্লাহর মহব্বত ও ভয় থেকে পয়দা হয় । আল্লাহ উপর ঈমান, তার গুণাবলীর দয়া অনুগ্রহের গভীরে অনুভূতি থেকে মহব্বতের প্রেরণা সৃষ্টি হয় এবং তার অন্যগুণ রাগ, ক্ষোভ ও শাস্তি দানের ক্ষমতার ধারণা বিশ্বাস থেকে ভয়ের অনুভূতি জাগ্রত হয়। মহব্বত ও ভয়ের এ মানসিক অবস্থার নাম তাকওয়া যা সকল নেক কাজের উৎস এবং সকল পাপ কাজ থেকে বাঁচার সত্যিকার উপায়।

প্রকৃত রোযাঃ- রোযার এ মহান উদ্দেশ্য তখনই হাসিল করা যেতে পারে যখন রোযা পূর্ণ অনুভূতির সাথে রাখা হবে এবং ঐ নিষিদ্ধ কাজ থেকে রোযাকে রক্ষা করা হবে। যার প্রভাবে রোযা প্রাণহীন হয়ে পড়ে। প্রকৃত রোযা হলো যার সাহায্যে মানুষ তার মন মস্তিষ্ক ও সকল যোগ্যতাকে আল্লাহর নাফরমানি থেকে বাঁচিয়ে রাখে এবং প্রবৃত্তির চাহিদা পদদলিত করে।
* রাসূল (সাঃ) বলেনঃ- যে ব্যক্তি রোযা রেখে মিথ্যা কথা বলা এবং মিথ্যা আচরণ থেকে বিরত হলো না, তার ক্ষুধার্ত ও তৃষ্ণার্ত থাকায় আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই। (বুখারী)
*এমন বহু রোযাদার আছে যে, রোযাদার ক্ষুধা তৃষ্ণার্ত ভোগ করা ছাড়া তাদের নেকীর পাল্লায় আর কিছু পড়ে না। (মিশকাত)
এবার আসুন রোযাপালনকারীর জন্য কি সু-সংবাদ রাসূলে কারীম (সাঃ) দিয়েছেন এবং তাদের মর্যাদা কত উর্ধ্বে জেনে নেই ;

১. হযরত আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত। রাসূল (সাঃ) বলেনঃ- যে ব্যক্তি আল্লাহর পথে একটি জিনিস দান করবে তাকে জান্নাতের দরজা থেকে এই বলে ডাকা হবেঃ হে আল্লাহর বান্দা! এই যে এই দরজাটি তোমার জন্য ভালো। কাজেই নামাযীদেরকে নামাযের দরজা হতে ডাকা হবে। মুজাহিদদেরকে ডাকা হবে জিহাদের দরজা হতে। রোযাদাদেরকে ডাকা হবে “রাইয়্যান” দরজা হতে । দাতাদেরকে ডাকা হবে সদাকার দরজা হতে । আবু বকর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (সাঃ)! আমার বাপ মা আপনার জন্য উৎসর্গ হোক, কোন ব্যক্তিকে কি এ সবগুলি দরজা থেকে ডাকা হবে ..? যদিও এর কোন প্রযোজন নেই। জবাব দিলেন হ্যাঁ । আর আমি আশা করি তুমি সবগুলোতে অর্ন্তভূক্ত হবে। (বুখারী ও মুসলিম)

২. সাহল ইবনে সাদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত। নবী (সাঃ) বলেনঃ- জান্নাতের একটি দরজা আছে । তাকে বলা হয় রাইয়্যান। কিয়ামতের দিন এই দরজা দিয়ে কেবল মাত্র রোযাদারগণ প্রবেশ করবে। তারা ছাড়া এই দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। বলা হবে রোযাদারগণ কোথায় ? তখন রোযাদারগণ দাড়িয়ে যাবে, তাদেরকে প্রবেশের আদেশ দেওয়া হবে। রোযাদারগণ প্রবেশ করার পর দরজা টি বন্ধ করে দেওয়া হবে। এবং তারপর এই দরজা দিয়ে আর কেউ প্রবেশ করতে পারবে না। (বুখারী ও মুসলিম)

৩. আবু হুরায়রা (রা থেকে বর্নিত। নবী করীম (সা বলেছেন, যে ব্যক্তি পূর্ণ ঈমান সহকারে ও সাওয়াব লাভের প্রত্যাশায় রমযানের রোযা রাখে, তার পূর্বের সমস্ত গুনাহ মা’ফ করে দেওয়া হয়। (বুখারী ও মুসলিম)

৪.আবু হুরায়রা (রা থেকে বর্ণিত। রাসূল (সা বলেছেন, যখন রমযান মাস আসে, জান্নাতের দরজা সমূহ খুলে দেওয়া হয় । আর জাহান্নামের দরজাসমূহ বন্ধ করে দেওয়া হয়। এবং শয়তানকে শৃংখলিত করে রাখা হয়। (বুখারী ও মুসলিম)

শেষ কথা:- সত্যিকার মুমিন বান্দা সর্বদাই আল্লাহর এবাদত করবে। কোন নির্দিষ্ট মাস, জায়গা অথবা জাতির সাথে মিলে আমল করবে না, বরং সর্বদা সে এবাদত করবে। মুমিন বান্দা মনে করবে যিনি রমযানের প্রভূ তিনি অন্যান্য সকল মাসেরও প্রভূ । তিনি সকল কাল ও স্থানের প্রভূ । রমযান শেষ হয়ে গেলেও শাওয়ালের ছয় রোযা, আশুরা, আরাফা, সোমবার, বৃহস্পতিবার ইত্যাদি নফল রোযা রয়েছে। তারাবীহের নামায শেষ হয়ে গেলেও তাহাজ্জুদ নামায বাকি আছে সারা বছর। অতএব নেক আমল সব সময় করা যায়। আল্লাহ আমাদের সকলকে সেই তাওফীক দান করুন। আমীন
সবটুকু একত্রে পড়ুন "মাহে রমাযান ও রোযার ফযীলত"

খোশ আমদেদ মাহে রামাযান

রামাযান মানে কি?‎

রমাযান আরবী শব্দ। আরবী মাস সমূহের মাঝে একটি মাসের নাম। যার আভিধানিক অর্থ ঝলসিয়ে দেয়া, ‎জ্বালিয়ে দেয়া। রামাযানকে রামাযান এজন্য বলা হয়-(ক) সর্ব প্রথম যখন রামাযানে রোযা ফরয হয় তখন ‎প্রচন্ড গরম ছিল তাই এ মাসকে রামাযান বলা হয়। (খ) রামাযান মাসে আল্লাহ তায়ালা তার অবারিত ‎রহমত ও বরকত দিয়ে বান্দার পূর্ব মাসের গোনাহকে পুড়িয়ে ছাই করে দেন, এ হিসেবেও একে রামাযান ‎বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রোযা কাকে বলে?‎

আরবীতে যে শব্দকে সিয়াম বলে বলে তাকেই আমরা বাংলা উর্দু ও ফারসীতে রোযা বলে থাকি। রোযা ‎মৌলিকভাবে তিন যিনিস থেকে নিয়তের সাথে বিরত থাকার নাম। যথা-(ক) সহবাস (খ) খাবার গ্রহণ (ঘ) ‎পানীয় গ্রহণ।

রোযার ইতিহাস

দ্বিতীয় হিজরীতে মদীনায় থাকা অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাজিল করার মাধ্যমে রোযাকে ফরয ‎করেন মুসলমানদের উপর। মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে সূরায়ে বাক্বারার ১৮৩ নং আয়াতে ‎ইরশাদ করেন-‎‏ يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ‎ অর্থাৎ হে ‎মুমিনরা! আমি তোমাদের উপর রোযাকে ফরয করেছি যেমন ফরয করা হয়েছিল পূর্ববর্তীদের উপর যেন ‎তোমরা পরহেযগার হতে পার।(সূরা বাক্বারা-১৮৩) এই আয়াতের মাধ্যমে একথা স্পষ্ট বুঝা যায়, ‎উম্মাতে মুহাম্মদীর পূর্বে অন্য নবীর উম্মাতের উপরও রোযা ফরয ছিল। যেমন বিভিন্ন তাফসীর গ্রন্থে যে ‎বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে তার সারাংশ হচ্ছে-কারো কারো মতে পূর্বের সকল উম্মতের উপরই তা ‎ফরয ছিল কারো কারো মতে কিছু কিছু উম্মতের উপর। তবে এ ব্যাপারে প্রায় সবাই একমত যে, ‎খৃষ্টানদের উপর রামাযানের রোযা ফরয ছিল উম্মাতে মুহাম্মদীর মত। খৃষ্টানদের ক্ষেত্রে বিধান ছিল ‎রামাযানের রাতে ঘুমানোর পর থেকে পরদিনের সূর্য অস্তমিত হওয়া পর্যন্ত পানাহার ও স্ত্রী সহবাস করতে ‎পারবেনা। এ বিষয়টি তাদের কাছে কঠিন মনে হলে শীত ও গ্রীষ্মকালে তারা মনমত রোযার সংখ্যা পাল্টে ‎নিত। অর্থাৎ যে সময়ের রমাযান মাস কষ্টদায়ক হত সে সময় তারা রোযা ১০ টা রাখতো পরের বছর ২০ ‎টি অতিরিক্ত রেখে রোযা ৫০টি রাখত। রোযার ফরয হবার পরও খৃষ্টানদের উপর আপতিত বিধান অনুযায়ী ‎মুসলমানরা রোযা রাখতে শুরু করেন। অর্থাৎ রামাযানের রাতে ঘুমানোর পর থেকেই রোযা শুরু হয়ে ‎যায়। ঘুম থেকে জেগে কোন কিছু পানাহার করা ও স্ত্রী সহবাস করতে পারবেনা। পরবর্তীতে আবু কায়েস ‎বিন সারমা রাঃ সহ কিছু সাহাবী আবেদন করলে আল্লাহ তায়ালা সহজতার আয়াত নাজিল করে জানিয়ে ‎দিলেন সুবহে সাদিকের আগ পর্যন্ত রোযা নেই। পর থেকে রোযা শুরু। (তাফসীরে তাবারী-৩/৪০৯) ‎

খোদাভীরু হবার মাস মাহে রামাযান

আল্লাহ তায়ালা বলেছেন আমি তোমাদের উপর রোযা ফরয করেছি যেন তোমরা মুত্তাকী তথা খোদাভীরু ‎হতে পার। রোযার মাধ্যমে একজন বান্দা খোদাভীরু এভাবে হয় যে, একাকি চুপটি ঘরে রোযাদার যখন ‎থাকে তখন সে ইচ্ছে করলেই পানাহার করতে পারে কিন্তু সে এ থেকে কেবল বিরত থাকে আল্লাহর ‎আদেশ অমান্য হয়ে যাবার ভয়ে, একাজটি সে করে থাকে শুধু আল্লাহর ভয়ে, কারণ সেখানেতো কোন ‎মানুষ তাকে দেখছেনা। সুতরাং রোযা রাখাটাই খোদাভীরুতার একটি পরিচায়ক। সুতরাং রামাযানে এই ‎প্রশিক্ষণ নিয়ে অন্য সময়ে যেন বান্দা কোন গোনাহ করতে আল্লাহ দেখছেন এই ভয়ে বিরত থাকে এর ‎একটি প্রশিক্ষণও এই রামাযান। এজন্যই আল্লাহ বলেছেন তোমরা মুত্তকী হবার জন্য আমি রোযাকে ফরয ‎করেছি।

রামাযানের ফযীলত

عن أبي هريرة : قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم إذا كان أول ليلة من شهر رمضان صفدت الشياطين ومردة الجن ‏وغلقت أبواب النار فلم يفتح منها باب وفتحت أبواب الجنة فلم يغلق منها باب وينادي مناد يا باغي الخير أقبل ويا باغي ‏الشر أقصر ولله عتقاء من النار وذلك كل ليلة قال وفي الباب عن عبد الرحمن بن عوف و ابن مسعود و سلمان ‏
قال الشيخ الألباني : صحيح ‏
অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ বলেছেন-যখন রামাযানের প্রথম রাত আসে ‎তখন শয়তান ও জীনদের পায়ে বেড়ি পড়ানো হয়। এবং জাহান্নামের দরজা বন্ধ করে দেয়া হয়, তাই ‎জাহান্নামের কোন দরজা খোলা থাকেনা, ও জান্নাতের দরজা খুলে দেয়া হয়, এমনকি জান্নাতের কোন ‎দরজা বন্ধ থাকেনা। আর একজন আহবানকারী ডাকতে থাকে-হে কল্যাণ প্রার্থী! এগিয়ে এসো! আর ‎মন্দতাপ্রার্থী! তুমি ফিরে যাও! আর আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে অনেক গোনাহগারকে জাহান্নাম থেকে ‎মুক্তি দেয়া হয়।(অর্থাৎ তার ক্ষমার সীদ্ধান্ত গৃহিত হয়।) (তিরমিজি শরীফ-রামাযান অধ্যায়)‎
عن أبي هريرة : قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم من صام رمضان وقامه إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه ومن ‏قام ليلة القدر إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه ‏
অনুবাদ-হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন-যে ব্যাক্তি ঈমানের সাথে ও ‎পূণ্যের আশায় রামাযানের রোযা রাখে আর ঈমানের সাথে পূণ্যের আশায় শুয়ার পূর্বে নফল(তারাবীহ) ‎পড়ে তার পূর্বের সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। আর ঈমানের সাথে পূণ্যের আশায় শবে কদরে নফল ‎পড়ে তার পূর্বের সকল গোনাহ মাফ করে দেয়া হয়। (তিরমিজী শরীফ-রামাযান অধ্যায়)‎

সেহরীর ফযীলত

أنس بن مالك رضي الله عنه قال : قال النبي صلى الله عليه و سلم ( تسحروا فإن في السحور بركة ) ‏
অনুবাদ-হযরত আনাস রাঃ থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন-তোমরা সেহরী খাও কেননা সেহরীতে ‎বরকত নিহিত। (বুখারী শরীফ-২/৬৭৮)‎
عن عمرو بن العاص أن رسول الله -صلى الله عليه وسلم- قال فصل ما بين صيامنا وصيام أهل الكتاب أكلة السحر
অনুবাদ-হযরত আমর বিন আস থেকে বর্ণিত রাসূল সাঃ ইরশাদ করেন-আমাদের ও আহলে কিতাবীদের ‎মাঝে রোযার মাঝে পার্থক্য নির্ণায়ক হল সেহরী খাওয়া। (মুসলিম শরীফ-৩/১৩০)‎

বান্দাদের পূণ্য আর গোনাহমুক্তির ক্ষেত্রে বোনাসময় মাস

গোনাহগার বান্দাদের গোনাহ মাফের ব্যাপকতার জন্য এ মাস এক বিশাল সুযোগের মাস। রামাযানের ‎শুরু থেকেই গোনাহ মাফের যে অফার শুরু হয় তা থাকে ঈদের চাঁদ উঠা পর্যন্ত। একবার কোন ইবাদাত ‎করলে অন্য মাসে ৭০ বার সে ইবাদাত করার সোয়াব পাবার নিশ্চয়তা। সুবহানাল্লাহ! মহান আল্লাহর ‎অবারিত মাগফিরাত আর বরকতপূর্ণ এ মাস। এ মাসে যেন আল্লাহ তায়ালা ক্ষমা আর বরকতের ঝাঁপি ‎খুলে দিয়েছেন। ‎
من تقرب فيه بخصلة من الخير كان كمن أدى فريضة فيما سواه و من أدى فيه فريضة كان كمن أدى سبعين فريضة فيما سواه ‏‎ ‎
অনুবাদ-সালমান রাঃ থেকে বর্ণিত একদা নবীজী সাঃ খুতবায় বলেন-যে ব্যক্তি এ মাসে (নফল) নেক ‎আমলের মাধ্যমে আল্লাহর নৈকট্য অর্জন করবে, সে ঐ ব্যক্তির ন্যায় হবে যে রামাযান ছাড়া অন্য সময় ‎একটি ফরয আদায় করল, আর যে ব্যক্তি এ মাসে একটি ফরয আদায় করবে সে যেন অন্য মাসের সত্তরটি ‎ফরয আদায় করল। (সহীহ ইবনে খুজাইমা-৩/১৯১)‎


সবটুকু একত্রে পড়ুন "খোশ আমদেদ মাহে রামাযান"

হজরত মুহাম্মদ (সা•)-এর শৈশবের দিনগুলো

সবাইকে পবিএ মাহে রামাজানের মোবারক বাদ
সন্মানিত পাঠক বৃন্দ অনেক আগের সংরক্ষিত এই লেখাটা আপনাদের কাছে শেয়ার করলাম। যদি কারো ভালো লাগে ভাব বেন সেটা আল্লাহর রহমত আপনার জন্য। আর না লাগলে আমার কিংবা লেখক সাহেবের ব্যার্থতা বলে মনে করবেন।

রবিউল আউয়াল মাস। চারদিকে আনন্দের প্লাবন। ভোরের সূর্যের আলোর সঙ্গে অন্ধকার পৃথিবীর বুকে নেমে এলো এক মানব শিশু। যে শিশুর মুখ দেখে চমকে ওঠে তৎকালীন সমাজের স্বার্থবাদীরা। তারা বুঝতে পারেন কুরাইশ বংশের এই শিশু যে সত্যি আলোর ঝলকানি। তা না হলে আজ মক্কার বুকে এতো সুবাস কেনো?
ধূ ধূ মরুর চর মক্কার ঘরে ফুটলো এক মনলোভা লাল গোলাপ। সেই ফুলের সুবাসে মেতে ওঠে আকাশ, বাতাস, গাছপালা, তরুলতা। গাছের ডালে ডালে পাখিরা গান গায়। ক্ষণিকের জন্য সমস্ত পৃথিবী থমকে দাঁড়ায়। মক্কাবাসীরা দেখতে পেলো পুণ্যবতী মা আমিনার কোল উজ্জ্বল করে বসে আছেন সেই চিরবাঞ্চিত আলোক শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) যিনি ব্যথিত বঞ্চিত মানুষের ধ্যানের ছবি। কুটিল সমাজের ব্যথিতজনের আশ্রয়স্থল হয়েই যেনো আল্লাহর পিয়ারে বান্দা হাজির হয়েছেন।
মুহাম্মদ (সাঃ) জন্মের আগেই হারিয়েছেন পিতাকে। মায়ের কোলে পিতৃহারা শিশু। আহ কি প্রাণহারা দীপ্তি। কতো নির্মল মাধুরীময় দেখাচ্ছে। তার রূপের কাছে সবকিছুই যেনো ম্স্নান। কে এ শিশু? মা আমিনা শিশু মুহাম্মদ (সাঃ)- কে বুকে জড়িয়ে নিতেই তার বুক চিরে কান্না বেরিয়ে আসে। কারণ এ সময়ে সারা আরব জাহানেই চলছে ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। মানুষ মানুষের ওপর জবরদস্তি। এক গোত্র আরেক গোত্রের ওপর আক্রমণ করছে। কে কার সম্পদ লুটে নেয় তার হিসেব নেই। মায়ের চিন্তা আমারঃ । কিন্তু সৃষ্টিকর্তা ভাবেন অন্য কিছু।

বিশ্বস্রষ্টা আল্লাহ তায়ালা জানেন এ শিশুই একদিন পৃথিবীর মানব সমাজ, মানুষে মানুষে সৌহার্দ, সৃষ্টিকর্তার আরাধনা বাদ দিয়ে যারা শত্রুতা, হালাল হারাম, ভালো মন্দ বাছবিচার না করে দুনিয়ার মায়াজালে আটকে আছেন তাদেরকে এক আল্লাহর অনুগামী করে সমাজ ও ধর্ম কর্মের পথে এনে শুধু মানুষের কল্যাণকর চির সুন্দর ও সৃষ্টিকর্তার নির্দেশিত সমাজ ব্যবস্থা কায়েম করবেন।
মুহাম্মদ (সাঃ) জন্মের আগে থেকেই আরব জুড়ে মহা দুর্ভিক্ষ চলছে। পুরো মক্কা নগরীর মানুষ অতি কষ্টে দিনাতিপাত করছেন। হালিমা বিবিও খুব গরীব। তাই জীবন ধারণের জন্য স্বামী ও সন্তানেরা মাঠে মাঠে গিয়ে ঘাস সংগ্রহ করে তা সামান্য মূল্যে বিক্রি করে কোনো রকমে পরিবার-পরিজন নিয়ে চলেন। এভাবেই দিন চলছিলো। হালিমা বিবি মনে মনে স্থির করলেন, মক্কা নগরীতে দুধ মাতাদের কদর আছে। ওখানে গেলে হয়তো একটি সন্তান লালন পালনের জন্য পাওয়া যাবে। তাতে নিজের সংসারে কিছু আয় বাড়বে। এ সময় আরবদের মাঝে রেওয়াজ ছিলো শিশুদের দুধ মাতাদের কাছেই লালন পালন করতে দেওয়া। তাই হালিমা বিবি নিজের শিশু পুত্রকে বুকে নিয়ে একটি সাদা গাধার পিঠে চড়ে বসলেন। তার স্বামী বসলেন একটি উটের পিঠে। উটটি দুধেল হয়েও দুধ দিচ্ছিলো না। ক্ষুধার জ্বালায় কোলের শিশু পুত্র অঝোরে কাঁদছিলো। কিন্তু মায়ের বুকে দুধও নেই। ধূ ধূ বালুর বুকে কে দিবে শিশুর মুখে একটু দুধ? সঙ্গী-সাথীরাও একটু এগিয়ে আসলো না। রাত দিন পথ চলতে চলতে সবাই ক্লান্ত। কারো চোখে ঘুম নেই। পানির পিয়াসে সবার প্রাণ ওষ্ঠাগত। ক্ষুধার জ্বালায় গতর দুর্বল। তবু কেউ থেমে নেই। সবাই একটু স্বাচ্ছন্দ্যের আসায় মক্কায় উপস্থিত হয়ে তাঁবু পাতলো।
মক্কা নগরীতে দুধ শিশুর খোঁজে আসা অনেক মহিলাকে দেখতে পেয়ে দাদা আবদুল মোতালেব তাদের সবাইকে মুহাম্মদ (সাঃ) কে গ্রহণ করার অনুরোধ জানালেন। আবদুল মোতালেবের প্রস্তাব পেয়ে অনেকেই আগ্রহী হলো বটে; কিন্তু যখন জানতে পারলো শিশু মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পিতা নেই তখন একে একে সবাই পিছিয়ে যেতে থাকলো। কারণ তারা জানতো শিশুর পিতারাই শিশুর লালন পালনের জন্য মোটা অংকের পারিতোষিক দিতে পারে। কিন্তু মা আর দাদা কতোটুকুইবা দিতে পারবে? কয়েক দিনের মধ্যেই দুধ শিশু নিতে আসা সব মহিলাই তাদের কোলে তুলে নিয়েছে একজন করে শিশু। কিন্তু হালিমা বিবি কোথাও একজন শিশু সংগ্রহ করতে পারলেন না। এতোদূর এসে খালি হাতে ফিরে যাবে তা কি হয়। হালিমা বিবি স্বামীকে বললেন, ‘খোদার কসম, ওদের সাথে আমার খালি হাতে ফিরে যেতে মন চাইছে না। কাজেই আমি ওই এয়াতিম শিশুর কাছে যাবো এবং ওই শিশুকেই নিবো।’

কুরাইশ গোত্র আবদুল মোতালেবের সামনে হাজির হলেন। হালিমা বিবিকে পেয়ে আবদুল মোতালেব মনস্থির করলেন তাঁর শিশু নাতি মুহাম্মদ (সাঃ)-কে হালিমা বিবির কোলেই তুলে দিবেন। কিন্তু মা আমিনা কি বলেন? তাই হালিমা বিবি মা আমিনার ঘরে এসে মুহাম্মদ (সাঃ) সম্পর্কে কথাবার্তা বলতে লাগলেন। তাঁরা যখন কথা বলছেন তখন শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) বিছানায় ঘুমিয়ে ছিলেন। হালিমা বিবি মনে মনে ভাবলেন, আমি যাকে লালন-পালন করবো তাকে একটু দেখে নেই। একথা ভেবেই তিনি ঘুমন্ত শিশুর বিছানার পাশে গিয়ে বসলেন এবং শিশুকে দেখামাত্র তাঁর একটি হাত অবলীলায় শিশুর কচি শরীরে চলে গেলো আপন গতিতে।

আশ্চর্য হলেও সত্যি; হালিমা বিবি হাত রাখতেই শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) ঘুম ভেঙে জেগে উঠলেন। কিন্তু তাঁর মুখে হাসির ফোয়ারা বয়ে যাচ্ছে। শিশুর মনে হালিমা বিবি যেনো তাঁর আপনজন। হালিমা বিবি মনে মনে খুশি হলেন। মা আমিনা পুত্রের চেহারা ও হালিমা বিবির মনের ভাব বুঝতে পেরে নিজ পুত্রকে আপন বুকে জড়িয়ে নিয়ে আদর সোহাগে ভরে দিলেন। তারপর কান্নাজড়িত কণ্ঠে পুত্রকে হালিমার কোলে দিয়ে তাঁর ভালোমন্দ সব দায়িত্ব বুঝিয়ে দিলেন। শিশু মুহাম্মদ (সাঃ)- কে পেয়ে হালিমা বিবির বুক যেনো ভরে ওঠলো। তিনি কালবিলম্ব না করে শিশু মুহাম্মদ (সাঃ)-কে নিয়ে নিজের বাড়ির দিকে রওয়ানা হলেন।

যিনি জগত সৃষ্টি করেছেন তার রহস্য মানুষ কিভাবে বুঝবে? হালিমা বিবি আল্লাহর নূরে তৈরি মানুষের কান্ডারি শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) কে সযত্নে নিজের বুকে জড়িয়ে নিতেই তার মরুবুকে দুধের জোয়ার নেমে এলো। এদিকে কুদরতের মহিমায় তাদের সঙ্গে থাকা দুধবিহীন উটের উলানে দুধের নহর বয়ে যেতে লাগলো। মায়ের বুকের দুধ পানে শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) এবং দুধ ভাই দু’জনেই পেট ভরে পান করে ঘুমিয়ে গেছে। হালিমা বিবি ও স্বামী তারাও উটের দুধ দুইয়ে দুজনে তৃপ্তিসহ পান করলেন। তারা বুঝতে পারলেন এ শিশু অন্য শিশুদের মতো নয়। এ শিশু তাদের জন্য মহাকল্যাণময় বার্তা নিয়ে তাদের বুকে এসেছে।
হালিমার কষ্টের বুকে শান্তির পরশ। মক্কায় আসার পথে যে গাধাটি পথ চলতে হিমসিম খাচ্ছিলো। সঙ্গীসাথীদের অনেক পিছনে ঝিমতে ঝিমতে আসছিলো সেই গাধাটিই সবার পিছন থেকে দ্রুতগতিতে একদিন আগে আসা সবাইকে পিছনে ফেলে যাচ্ছিলো দেখে কাফিলার লোকজন বলতে লাগলো, হে হালিমা একটু দাঁড়াও। তারা আরো বললো, হালিমা, এটা কি তোমার সেই গাধা নয়, যেটার পিঠে চড়ে তুমি মক্কায় এসেছিলে?

হালিমা বিবি তাদের প্রশ্নে বললেন, হ্যাঁ সেই গাধাটিই আমাকে বহন করে নিয়ে যাচ্ছে। বিস্ময়ভরা দৃষ্টি নিয়ে তারা সমস্বরে বললো, খোদার কসম, হালিমা তোমার গাধাটার অবস্থাই অনেক পাল্টে গেছে।
দিগন্ত বিস্তৃত মরুভূমি। শো শো বাতাস বয়ে যায় জীর্ণ কুটিরের ওপর দিয়ে। মাঝে মাঝে কিছু জমি সবুজ ঘাসে আচ্ছাদিত। ওখানে মেষ পাল আর উটের বহর ঘুরে বেড়ায়। শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) হালিমা বিবির কুটিরে আসার পর থেকে তাঁর অলস ছেলে মেয়েরা খুশি হয়ে মেষ পাল চড়াতে মাঠে যায়। তাদে মনে আনন্দ বেড়ে যায়। তাঁরাও দুধ ভাইকে আপন ভাই বলে স্নেহ করতে লাগলো। তাদের মাঝে কে আগে স্নেহ করবে এই নিয়ে লেগে যায় প্রতিযোগিতা। এদিকে ভাইয়ের জন্য তাদের কর্মচঞ্চলতা বেড়ে যায়। তারা কেউ মেষ নিয়ে মাঠে যায়। কেউ কেউ সবুজ ঘাস কেটে এনে বিক্রি করে সামান্য মুদ্রার বিনিময়ে। কিন্তু সামান্য মুদ্রা পেলেও হালিমা বিবির সংসারে ক্রমেই উন্নতি হতে লাগলো।

পূর্ব দিগন্তে ভোরের রক্তিম আলো ঝলমল। দুপুর বেলা ভেসে আসে তপ্তময় ঝাঁজালো বাতাস। বাতাসের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায় চকমকে দানাদার বালুকণা। প্রতিদিনই হালিমা বিবির ছেলে মেয়েরা মেষ নিয়ে মাঠে যায়। তাদের সঙ্গে শিশু মুহাম্মদ (সাঃ)ও যেতে বায়না ধরেন। কিন্তু তারা তাকে নিতে নারাজ। অবশেষে একদিন হালিমা বিবি মাঠে যেতে অনুমতি দিলেন। তিনি বুঝতে পেরেছেন একে আর ঘরে আটকে রাখা যাবে না। তাই তিনি আল্লাহকে স্মরণ করে শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) কে অনুমতি দিলেন।

শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) প্রকৃতির পাঠশালায় এসে দেখতে পেলেন, আহ্‌ কি সুন্দর চারণভূমি! চারণভূমির অদূরেই বিশাল বিশাল পর্বতমালা। পর্বতমালার ওপর ভেসে বেড়াচ্ছে নীল আকাশ। তার পাদদেশেই রয়েছে ফুল আর ফলে ভরা সবুজ বাগান। বাগানের গা ঘেঁষে বয়ে চলেছে স্বচ্ছ পানির ধারা। গাছে গাছে বসে থাকা নানা পাখির কণ্ঠে মিষ্টি মধুর সুর। পাখির সুরে ভরে ওঠে প্রাণ। অপূর্ব সে এক প্রাকৃতিক পরিবেশ। ভাবতে থাকেন কে এই সৃষ্টির মালিক?
শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) মেষ চরাতে এসে প্রকৃতির মাঝে হারিয়ে যান। শুনতে পান অদৃশ্য কারো বাণী। তাই অসীম চিন্তায় মগ্ন হয়ে পড়েন তিনি।

শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) মুক্ত আকাশের নিচে আসলেও তিনি অন্য ছেলেমেয়েদের মতো ছুটোছুটি করেন না। তিনি আকাশ, বাতাস, জীবজন্তু, পাহাড় পর্বত, সৃষ্টির রহস্য নিয়ে ভাবতে ভালোবাসেন। তাইতো সমসময় তাঁর মন ভাবগম্ভীর থাকে। শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) আপন মনে সৃষ্টির রহস্য দেখছেন। তিনি দেখতে পেলেন বেদুঈনদের জীবনযাত্রার মধ্যে কোনো কৃত্রিমতা নেই। তাদের জীবন প্রকৃতির মতোই গড়ে ওঠে। মরুর বুকের বেদুঈন জীবনের সঙ্গে থেকে মানুষের প্রকৃত স্বাধীনতা কাকে বলে তা সঞ্চারিত হচ্ছে। স্বদেশ প্রেম কাকে বলে তা উপলব্ধি করেন । তিনি বুঝতে পারেন শান্ত, সুসংহত, সংযমী জীবনের বিকল্প নেই।

শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) শিশু বেলায়ই তাঁর মিষ্টি কথায় মিষ্টি আচরণ দিয়ে বেদুঈন ছেলেমেয়েদের মনে গেঁথে যান। তাইতো তারা শ্রেষ্ঠ মানবশিশুকে সম্মান দিয়ে করেন মেষ পালকদের দলপতি। শিশু কালের শিক্ষাই মানব জীবনে সর্বাপেক্ষা উজ্জ্বল হয়ে থাকে। শিশু মুহাম্মদ (সাঃ)- এর শিক্ষা এমন স্থান হতে সংগৃহীত হচ্ছে যার বৈচিত্র্যের ভাণ্ডার কেউ দেখতে পায় না। তিনি তিল তিল করে সৃষ্টিকর্তার শিক্ষায় দীক্ষিত হচ্ছেন। আল্লাহ যাকে করবেন জগতবাসীর পথ প্রদর্শক তাকে তো আর সাধারণ শিক্ষায় শিক্ষিত করতে পারেন না। একদিন মাঠে গিয়ে শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) হারিয়ে যান। দুধ মাতা হালিমা পাগলের ন্যায় খোঁজাখুঁজি করে বেড়াচ্ছেন। তাঁর দু’চোখ বেয়ে পানি পড়ছে, তাকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছেন না। এখন কি হবে, কোথায় পাবে পরের ধনকে? তিনি অনেক জায়গায় খুঁজতে খুঁজতে অবশেষে তাঁকে পেলেন একটি গাছের নিচে। কিন্তু একি! আমার নয়নের মণি এভাবে গাছের নিচে পড়ে আছে কেনো? হালিমা বিবি তাড়াতাড়ি মুহাম্মদ (সাঃ) কে কোলে তুলে নিলেন।
হালিমা বিবি অবাক হলেন। তিনি বুঝতে পারছেন আমার মুহাম্মদ (সাঃ) কোনো সাধারণ মানুষ নয়। একে সবসময় নজরে নজরে রাখতে হবে। মনে মনে বললেন, আমিনা, ওগো আমিনা, তোমার নয়নকে পেয়ে আমি ধন্য। মদীনাবাসীর সৌভাগ্য মুহাম্মদের মতো একজন মহামানব লালন পালন হচ্ছে তাদের ঘরে। শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) আল্লাহর আহবানে ঘন ঘন সাড়া দিয়ে শুনছেন•• কোন সে সুগভীর বাণী••? তাঁর মনে হতো কে যেনো বহু দূর থেকে ডাকছেন। এদিকে স্নেহময়ী গর্ভধারিণী মা আমিনা তাঁর শিশু পুত্রকে কাছে পাবার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছেন। তাঁর মনে কতো প্রশ্ন জাগছে, তাঁর আদরের দুলাল মানবকুলের শিরোমনি শিশু নবীকে কতোদিন যেনো দেখেন না। পুত্রের জন্য মায়ের মন উতলা হয়ে ওঠে।

দিন যায়। মাস যায়। দুধ মা হালিমা বিবির কাছে কেটে গেলো কয়েকটি বছর। শিশু মুহাম্মদ (সাঃ) বেড়ে উঠছেন তরতর করে। মা হালিমা তাঁকে ছাড়া কিছুই বুঝেন না। তিনি বুঝতে পেরেছেন এ শিশুই একদিন হবে বিশ্ব ভূখণ্ডের জ্যোতিষ্ক। একে জীবনভর কাছে রাখতে পারলে ভালো হতো। কিন্তু সময়ের দাবী অনুযায়ী তাঁর গর্ভধারিণীর কাছে ফিরিয়ে দিতে হলো। একদিন মা আমিনা আবার ফিরে পেলেন তাঁর নয়নের মণিকে। কোলে তুলে নিয়ে চুমুতে চুমুতে ভরে দিলেন। মায়ের মনে আনন্দের সীমা নেই। কিন্তু যিনি আল্লাহর প্রেমের আলোক সম্বল করে এসেছেন জঞ্জালময় পৃথিবীতে তিনি কি শুধু মায়ের কোলে বসে থাকতে পারেন?

**************************
মো হা ম্ম দ স ফি উ দ্দি ন
দৈনিক ইত্তেফাক, ২০-০৬-২০০৮
সবটুকু একত্রে পড়ুন "হজরত মুহাম্মদ (সা•)-এর শৈশবের দিনগুলো"

বিবেক মানবদেহের সঞ্চালক

হযরত নোমান ইবনে বশির রা. বলেছেন- আমি রাসূলুল্লাহ সা.-কে বলতে শুনেছি যে ইসলামে ‘হালাল-হারাম’ স্পষ্ট। এ দুটির মাঝে কতোগুলো ‘সন্দেহভাজন’ বিষয়বস্তুও আছে। সেগুলো কোন পর্যায়ে তা অধিকাংশ লোকই নিশ্চিতভাবে নির্ধারণ করতে পারে না। যে ব্যক্তি সে সন্দেহজনক বিষয়গুলো থেকে সংযমি হবে তারই দীন-ঈমান ইজ্জত-আবরু সুরক্ষিত থাকবে। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি সন্দেহজনক বিষয়বস্তুসমূহে লিপ্ত হবে, তার অবস্থা হবে কোনো রাখাল তার পশুপালকে (সরকারী বা কারো) সংরক্ষিত স্থানের নিকটবর্তী চরিয়ে থাকে; এমতাবস্থায় অ- সময়ের মধ্যেই তার পশুগুলো সে সংরক্ষিত এলাকায় ঢুকে পড়বে (এবং তার দ্বারা রাখাল বিপদগ্রস্ত হবে। তেমনি মধ্যস্থলিয় সন্দেহযুক্ত বিষয়বস্তুগুলো থেকে যে ব্যক্তি সংযমি না হবে এবং তা থেকে দূরে না থাকবে, অচিরেই অনিবার্যভাবে তার নফস বা প্রবৃত্তি স্পষ্ট হারামে লিপ্ত হয়ে যাবে, ফলে সে দুনিয়া ও আখেরাতে অপদস্থ হবে) তোমরা শুনে রাখ, প্রত্যেক বাদশাহর সংরক্ষিত এলাকা থাকে তেমনি আল্লাহ তায়ালার নিষিদ্ধ বিষয়বস্তুসমূহই দুনিয়ার বুকে তার সংরিক্ষত এলাকা। (সেখানে কারো প্রবেশ করতে নেই, অধিকন্তু তার নিকটবর্তী হওয়া তথা সন্দেহজনক বিষয়ে লিপ্ত হওয়াও উচিত নয়।

আরো শুনে রাখ মানবদেহে এমন একটি অংশ রয়েছে যে, সেই অংশটি যখন যথার্থভাবে ঠিক হয়ে যায়, তখন মানুষের পূর্ণ অস্তিত্ব ঠিক হয়ে যায়। অর্থাৎ সম্পূর্ণ মানবদেহটিই তখন সঠিকভাবে পরিচালিত হতে থাকে। পক্ষান্তরে সেই অংশটি যখন খারাপ হয়ে পড়ে, তখন সমস্ত অস্তিত্বটিই খারাপ হয়ে যায়। অর্থাৎ মানব দেহের কোনো অংশ বা কোনো অঙ্গই তখন সঠিকভাবে পরিচালিত হয় না। খুব ভালো করে জেনে নাও সে অংশটি হুে ছ মানুষের বিবেক।

বিশ্লেষণ : শরিয়তের যাবতীয় হুকুম-আহকাম চার প্রকার দলিল ভিত্তিতে প্রমাণিত হয় । কুরআন, হাদিস, ইজমা ও কিয়াস। এর যে কোনো একটি দ্বারা যে কোনো বিষয় সুনির্দিষ্টভাবে ‘হালাল’ বৈধ ও গ্রহণীয় বলে প্রমাণিত হবে যে এটিই হালাল এবং যে কোনো বিষয় সুষ্পষ্টভাবে ‘হারাম’ নিষিদ্ধ ও বর্জনীয় বলে প্রমাণিত হবে তা হারাম।

এ দৃষ্টিকোণ থেকে হালাল এবং হারাম অতি স্পষ্ট এবং এই সকল দলিল, প্রমাণ ও মাপকাঠি দ্বারা উভয়টিকে বেছে নেয়া অত্যন্ত সহজ। অধিকন্তু এটিও স্পষ্ট যে, হালালকে গ্রহণ করা যাবে এবং হারামকে বর্জন করতে হবে। এতে বিন্দুমাত্রও নড়চড় করার অবকাশ নেই। কিন্তু হালাল ও হারাম পর্যায়দ্বয়ের মধ্যবর্তী আরো কিছু পর্যায় রয়েছে। যথা মাকরূহ, খেলাফেআওলা বা অবাঞ্ছনীয়, ইমাম ও খাঁটি ওলামাদের মতোবিরোধমূলক বিষয়াদি।

এতদ্ব্যতীত এমন আরো বহু বিষয়াদি আছে যা শরিয়তে লিপিবদ্ধ আছে এবং তা ছাড়াও দৈনন্দিন কার্যকলাপের ভেতর দিয়ে প্রায়শই এমন বিষয়াদি আমাদের সম্মুখবর্তী হতে থাকে যা নির্দিষ্টভাবে হালাল বলেও নিশ্চিত হওয়া যায় না, কিংবা হারাম বলেও স্থির করা যায় না এ সকল অনিশ্চিত ও সন্দেহভাজন বিষয়গুলোকে সযত্মে পরিহার করে চলাই একান্ত বাঞ্ছনীয়। কেননা এ সমস্ত সন্দেহজনক বিষয়বস্তুসমূহ থেকে বিরত থাকলে এক দিকে জাগতিক ব্যাপারে যেমন লাভবান হওয়া যায়, কারণ সন্দেহের স্থানে পা রাখলেই স্বীয় মান-মর্যাদা কলুষিত হওয়ার এবং নানা প্রকার কুৎসা রটানোর সুযোগ উপস্থিত হয়।

অন্যদিকে তেমনি দীনের ব্যাপারেও লাভের সীমা থাকে না। কারণ যে ব্যক্তি স্বীয় নফ্স ও প্রবৃত্তিকে সন্দেহের স্থান থেকে বিরত রাখতে অভ্যস্ত হবে, সে নিশ্চয় যাবতীয় কুপ্রলোভনের বস্তু থেকে এবং যাবতীয় হারাম কাজ থেকে স্বীয় নফ্সকে ফিরিয়ে রাখতে সক্ষম হবে।

হারাম ও সন্দেহভাজন কাজ থেকে বাঁচতে হলে সর্বপ্রথম নিজের বিবেককে যথার্থভাবে সুষ্ঠু ও ঠিক করতে হবে। কারণ মানুষের বিবেকই মানবদেহরূপী কারখানার জন্য বৈদ্যুতিক মটর স্বরূপ। মটর ঠিকভাবে চালু থাকলে কারখানার প্রতিটি শাখা তার প্রতিটি অংশ ও সমস্ত কল-কবজার চাকাগুলো রীতিমত চলতে থাকবে। আর মটরে গোলযোগ থাকলে তার সংযোগ রক্ষাকারী সমস্ত মেশিন ও তার অংশগুলোর মধ্যেও গোলযোগ দেখা দিবে। অবশ্য মটরের সঙ্গের চাকাগুলো সক্রিয়সংযোগ রক্ষার প্রতিও তীক্ষè দৃষ্টি রাখতে হবে। তা না হলে মেশিনের বিভিন্ন অংশের সঙ্গে সংযোগবিহীন শুধু মটর চালালে উদ্দেশ্য সফল হবে না এবং এ ধরনের নিরর্থক ও অনিয়মিত পরিচালনার ফলে কারখানা ফেল হয়ে যাবে। অতএব মেশিনের সমস্ত কল-কবজা ও তার বিভিন্ন অংশগুলোকেও রীতিমত চালু রেখে মোটরের প্রতি সবিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। কারণ, তার ভাল-মন্দের প্রভাব সমস্ত কারখানার ওপর পড়ে থাকে। তেমনিভাবে মানুষের কর্তব্য তার বিবেক-বুদ্ধিকে সুষ্ঠু করে তার পর সেই সুষ্ঠু জ্ঞান-বিবেক দ্বারা স্বীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গকে পরিচালিত করা।



দেহ আলোচনা

উপরোক্ত হাদিসের শেষ বাক্য ‘আলা ইন্নাফিল জাছাদে মুজগাতান’ মানবদেহের মধ্যে একটি বিশেষ অংশ আছে যার উন্নতি-অবনতির উপর সম্পূর্ণ দেহের উন্নতি ও অবনতি নির্ভর করে। এ তথ্যটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এতে মানুষের সৃষ্টি তত্ত্ব ও দেহ-তত্ত্বের ইঙ্গিত দানে মানবের প্রকৃত উন্নতির উপায় উদ্ভাবন করা হয়েছে এবং সতর্ক করা হয়েছে যে, স্থূল দেহের উন্নতি অপেক্ষা সূক্ষè আত্মার উন্নতির ওপরই মানুষের প্রকৃত ও মুখ্য উন্নতি নির্ভর করে। আত্মার উন্নতি সাধিত না হলে মানব জীবন বিফল ও অত্যন্ত বিড়ম্বনায় পড়তে হয়।

মানুষের অজুদ বা অস্তিত্ব দুই ভাগে বিভক্ত স্থুলদেহ’ যা বাহ্য দষ্টিতে বা যান্ত্রিক সাহায্যে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হয়ে থাকে এবং ‘সূক্ষèআত্মা’ যা ঐরূপে ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য হতে পারে না। মানুষের স্থুলদেহ সৃষ্টির মূলে যেমন বিভিন্ন উপাদান রয়েছে যথা পানি, মাটি, বায়ু ও অগ্নি তেমনি তার এ ভৌতিক দেহাভ্যন্তরে পাঁচ প্রকারের আত্মাও রয়েছে। যথা

১। পশুর আত্মা, যা দ্বারা খাওয়া শোয়া, কামরিপু চরিতার্থ করা ইত্যাদি প্রবৃত্তির উদ্রেক হয়।

২। হিংস্র জীবের আত্মা : যা দ্বারা দ্বেষ, হিংসা, ক্রোধ ও রাগের বশীভূত হয়ে মারামারি কাটাকাটি করত: প্রতিশোধ গ্রহণের প্রবৃত্তি জন্মে থাকে।

৩। শয়তানের আত্মা : যার প্ররোচনায় পাপাচার, অহঙ্কার, মিথ্যা ও সূক্ষ্ম কূট-কৌশলের দ্বারা মানুষকে ধোকা দেয়া ইত্যাদির প্রবৃত্তি উদিত হয়।

৪। ফেরেশতা আত্মা : যা দ্বারা সদাচার, ন্যায়পরায়ণতা, সততা, সত্যতা, পরোপকারিতা ও আল্লাহর বশ্যতা স্বীকার করা ইত্যাদির আগ্রহ ও আকর্ষণ জন্মে থাকে।

৫। মানুষের আত্মা : যার কর্তব্য হুে ছ প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় আত্মাকে বশ করত: তাদেরকে কুপ্রবৃত্তির দিক থেকে ফিরিয়ে দিয়ে ফেরেশতা আত্মার সদগুণাবলীতে গুণান্বিত ও পরিচালিত করা এবং আল্লাহর মারেফত ও মহব্বত হাসিল করত: দুনিয়াতে আল্লাহর খেলাফত তথা আল্লাহর হুকুম আহকাম জারির পরিবেশ কায়েম করার আগ্রহ ও আকর্ষণ সৃষ্টি করা।

প্রথম তিনটি আত্মাকেই তাসাওফের পরিভাষায় ‘নফসে আম্মারা’ বলা হয় এবং চতুর্থ ও পঞ্চম এ দুটিকে রূহ, আ’ক্বল বা লতিফা বলা হয় এবং এটিই হুে ছ বিবেক, বুদ্ধি ও মানবাত্মা।

দেখা গেল যে, এই পাঁচ প্রকারের আত্মাই তাসাওফের পরিভাষায় দুই নামে পরিচিত হয়েছে। একটি হল নফসে আম্মারা; এর তিনটি বিভাগ যথা পশুরআত্মা, হিংস্রজন্তুরআত্মা ও শয়তানেরআত্মা। দ্বিতীয়টি হলো রু হ অর্থাৎ মানবাত্মা বা বিবেক -আকল। এর দুটি বিভাগ যথা ফেরেশতার আত্মা ও মনুষত্বেরআত্মা।

রাসূল সা. ‘আলা ইন্না ফিল জাছাদে মোজগাতান’ বলে মানব দেহের যে বিশিষ্ট অংশটির প্রতি নির্দেশ করেছেন, সে অংশটিই হুে ছ রু হ বা আকল-বিবেক। এর উন্নতিতে পূর্ণ মানবদেহের উন্নতি এবং এর অবনতিতে সম্পূর্ণ মানবদেহের অবনতি ঘটে থাকে; এটাই রাসূল সা. বলেছেন রু হ বা জ্ঞান-বিবেক রত্মটির উন্নতি হলে সমগ্র মানবদেহের উন্নতি হবে এবং এর অবনতিতে সমগ্র মানবদেহের অবনতি ঘটবে।

এখন দেখতে হবে যে, এই অংশটির উন্নতির অর্থ কী? বস্তুত প্রতিটি জিনিসের উন্নতি বা অবনতির বিচার করা হয় তার ওপর অর্পিত দায়িত্ব ও কর্তব্য পালনের দ্বারা। তাই এখন দেখতে হবে যে রু হ বা বিবেকের উপর কী কী দায়িত্ব ও কর্তব্য অর্পিত হয়েছে। এ প্রশ্নের উত্তর অতি সহজ। কারণ, রু হ মানবাত্মা বা বিবেক বলে যে দুটি আত্মার নামকরণ হয়েছিল অর্থাৎ ফেরেশতাআত্মা ও মনুষ্যত্বের আত্মা তাদের কর্তব্য ছিল সদাচার, সততা, সভ্যতা ও আল্লাহর বশবর্তীতা ইত্যাদির প্রতি আকৃষ্ট করা এবং সঙ্গে সঙ্গে নফস নামে যে অপর তিনটি শক্তি বা আত্মা আছে তাদেরকে বশে এনে ফেরেশতা আত্মার সদগুণাবলীতে পরিচালিত করা। অতএব রু হ বা বিবেকের দায়িত্ব ও কর্তব্যও তাই হবে। এ মহান কর্তব্য পালনে রু হ মানবাত্মা বা বিবেক যতোটুকু উন্নতি করতে পারবে, পূর্ণমানবদেহটি ততটুকুই উন্নতি লাভ করবে। এমনকি অবশেষে এই রু হ মানবাত্মা যে উর্দ্ধজগত থেকে এসেছিল পুনরায় সে মানবদেহকে নিয়ে সেই উর্দ্ধজগতে অর্থাৎ বেহেশতে গিয়ে পৌঁছবে। পক্ষান্তরে রূহ মানবাত্মা নিজের ঐ কর্তব্যে ত্রু টি করত: নিজেই যদি নফস তথা ঐ তিন প্রকার আত্মার বশ্যতা স্বীকার করার অবনতিতে পতিত হয়, তা হলে পূর্ণ মানবদেহই অবনতির তিমির গর্তে পতিত হবে। অবশেষে ঐ রু হ মানবাত্মা মানবদেহকে নিয়ে সর্ব নিু জগতে তথা জাহান্নামে পৌঁছাবে।

আধ্যাত্মিক জ্ঞানবিশারদগণ রু হ বা বিবেকের উন্নতির পাঁচটি স্তর বর্ণনা করেছেন এবং প্রত্যেকটির ভিন্ন ভিন্ন নামকরণ করেছেন। পূর্বেই ইঙ্গিত করা হয়ে ছিল যে, রু হ মানবাত্মা বা আকল ও বিবেককে তাসাওফের পরিভাষায় লতিফা নামেও নামকরণ হয়ে থাকে। সেই অনুসারেই রু হের উন্নতির পাঁচটি স্তরের নিুলিখিতরূপে নামকরণ করা হয়েছে।

১। লতিফায়েকলব : মানুষ যখন আল্লাহকে স্মরণ করে, আল্লাহর নাম উু চরণ করত: জিকির করে তখন সে এ লতিফায়ে কালবের কর্তব্য পালন করে।

২। লতিফায়ে রু হ : মানুষ যখন আল্লাহর মহৎ গুণাবলীর ধ্যান করে এবং এই ধ্যানের দ্বারা নিজের মধ্যেও ঐ গুণের প্রতিবিম্ব হাসিল করে, যেমন : আল্লাহ দয়ালু, দয়াময় এর ধ্যান করত: এমন অবস্থার সৃষ্টি করে যে, আমাকেও দয়ালু হতে হবে এবং দয়ালুর নিকট কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করতে হবে তখন হয় লতিফায়ে রু হের কর্তব্য পালন।

৩।
লতিফায়ে সের্র : মানুষ যখন আল্লাহর গুণাবলীর প্রতিবিম্ব নিজের মধ্যে হাসিল করায় সচেষ্ট হয় তখন তার সিনার অভ্যন্তরে আল্লাহর মারেফাতের বা আল্লাহর গুণাবলীর তত্বজ্ঞানের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন মানুষ আল্লাহর গুণে মুগ্ধ ও অভিভূতহয়ে আল্লাহর আশেক ও প্রেমিকে পরিণত হয়ে যায় এবং নিজের নফসের সব কুপ্রবৃত্তির প্রতি ঘৃণা জন্মে যায় এবং সেগুলোকে ফানা ও বিলুপ্ত করে দেয় অর্থাৎ সেগুলোকে পূর্ণরূপে দখল ও অধিকার করার শক্তি ও সামর্থ অর্জন করে, এটাই হুে ছ লতিফায়ে সের্র এর কর্তব্য।

৪।
লতিফায়ে খফী মানুষের মধ্যে যখন আল্লাহর মা'রেফতের দ্বার উন্মুক্ত হয়ে যায়, তখন মানুষ আল্লাহর গুণে মুগ্ধ ও অভিভুত হয়ে আল্লাহর আশেক ও প্রেমিকে পরিণিত হয়ে যায় এবং নিজের নফসের সব কুপ্রবৃত্তির প্রতি ঘৃণা জন্মে যায় এবং সেগুলোকে ফানা ও বিলুপ্ত করে দেয়। অর্থাৎ সেগুলোকে পূর্ণভাবে দখল ও অধিকার করার শক্তি ও সামর্থ অর্জন করে। এটাই হ্ছে লতিফায়ে খফীর কর্তব্য।
৫।
লতিফায়ে আখফা : মানুষ ফানা-ফিল্লাহ অর্থাৎ আল্লাহরগুণে গুণান্বিত হওয়ার মর্তবায় পৌঁছে, যাকে আল্লাহর খেলাফত লাভ বলে; এটাই হুে ছ লতিফায়েআখফার মর্যাদা। এ অবস্থাতেই রু হ বা বিবেক ও আকলের পূর্ণশুদ্ধি হয়ে যায়। এই অবস্থার পরে আর বিবেককে কুপ্রবৃত্তির বশীভুত হতে হয় না। রাসূল সা. মানুষকে বিবেক সঠিক করার যে প্রেরণা দান করেছেন তার উদ্দেশ্য হুে ছ মানবাত্মার পরম উন্নতিলাভ। সোনার বাংলাদেশ
সবটুকু একত্রে পড়ুন "বিবেক মানবদেহের সঞ্চালক"